হরমুজ খুলতে নিজেদের শর্তে অনড় ইরান

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের শর্ত থেকে সরে আসবে না বলে জানিয়েছে ইরান। রোববার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এ অবস্থান জানান। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়েছিলেন। তবে ওই প্রস্তাবকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা নিয়ে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় সাত মাস আগে ইরানে প্রাণঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে এ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে।
তেহরানে আরাঘচি বলেন, ইরানের পরিকল্পনায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সব ধরনের শত্রুতা বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক মাস আগে ভেঙে যাওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তগুলোও পূরণ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংঘাতের সময় ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ে। চুক্তিতে ইরানের জব্দ সম্পদ অবমুক্ত করা, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বন্ধ করার বিষয় ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে আরাঘচি বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপ নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে এবং তেহরান এসব শর্ত থেকে সরে আসবে না।
তিনি আরও বলেন, ইরান কখনো কূটনীতি বা আলোচনার পথ বন্ধ করেনি। একই সঙ্গে নিজেদের অধিকার থেকেও তারা সরে আসেনি।
এর আগে শনিবার ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, ইরান এমন একটি চুক্তি চায়, যার আওতায় তারা দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তিতে আগ্রহী এবং তিনিও চুক্তি করতে আগ্রহী।
রোববার আরাঘচি জানান, ইরান ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া যায়নি। মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান জানালে তার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
হরমুজ প্রণালি ‘চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার’ নয়
যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে কিছুদিন পরই সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
এরপর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমোদিত পথ থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগে ইরান কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের কারণ দেখিয়ে জাহাজগুলোকে চলাচলের আগে অনুমোদন নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে তেহরান।
ইরানের নির্দেশ অমান্যকারী কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানের উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালিয়েছে।
জাতিসংঘে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান অভিযোগ করেন, হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি উন্মুক্ত রাখার দায়িত্ব পালনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এসব নৌপথকে চাপ প্রয়োগ, হুমকি বা কোনো দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কোনো পক্ষেরই উচিত নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এসব নৌপথের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্যান্য দায়িত্বশীল দেশের সঙ্গে রাশিয়া গঠনমূলকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা ইরানের
নিউইয়র্কে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে তার কার্যালয়। বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আলোচনার পথ থেকে সরে যায়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের আস্থা কমে গেছে।
আরাকচি জাতিসংঘে জানান, কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান সাত দিনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
তার ভাষায়, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। ইরান কোনো ধরনের জবরদস্তি, হুমকি বা ভয় দেখানো মেনে নেবে না এবং চাপের মুখে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ত্যাগ করবে না।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেবির বরাত দিয়ে তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ হবে না।
মোহেবি এর আগে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শত্রুতা বন্ধের বিষয়ে ইয়েমেনও তেহরানের দাবির অন্তর্ভুক্ত।
