logo
Advertisement

লাগাতার বৃষ্টি ও নেপালের পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত ভারতের বিহার-পশ্চিমবঙ্গ

লাগাতার বৃষ্টি ও নেপালের পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত ভারতের বিহার-পশ্চিমবঙ্গ
গত প্রায় সাত দিনের বেশি সময় ধরে বন্যার সঙ্গে লড়াই করছে ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ছবি: এশিয়া পোস্ট

লাগাতার বৃষ্টি ও নেপাল থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যাকবলিত ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। ফুলেফেঁপে উঠেছে গঙ্গা ও তার শাখা নদীগুলো। গত প্রায় সাত দিনের বেশি সময় ধরে বন্যার সঙ্গে লড়াই করছে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ। দুই রাজ্যে সব মিলিয়ে বন্যাকবলিত প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিহারে। পশ্চিমবঙ্গে বন্যার পাশাপাশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নদীভাঙন।

বিহার

প্রায় ১০ দিন আগে থেকেই বিহারের গঙ্গাতীরবর্তী নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও মানুষের সমান এবং কোনো কোনো স্থানে একতলা বাড়ির উচ্চতার সমান পানি জমেছে। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতির কারণে ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। ১৫টি জেলার ৮৮টি ব্লকের ৫৬১টি গ্রাম পঞ্চায়েত বন্যাকবলিত।

প্লাবিত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে পটনা, ভোজপুর, সারণ, বৈশালী, ভাগলপুর, বেগুসরাই, বক্সর, সমস্তিপুর, মুঙ্গের, কাটিহার, লখিসরাই, খাগাড়িয়া, পূর্ণিয়া, মাধেপুরা এবং আরারিয়া। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ভাগলপুর, পটনা, সারণ, বৈশালী, বেগুসরাই, কাটিহার, পূর্ণিয়া এবং বক্সরে।

পশ্চিমবঙ্গে বন্যায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালদা জেলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পশ্চিমবঙ্গে বন্যায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালদা জেলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বন্যাদুর্গত মানুষদের মধ্যে ৩ লাখ ত্রিপল ও ৪৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ বিতরণের জন্য ১,৯২২টি নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ২৭টি দল এবং দেশটির জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ১০টি দল মোতায়েন করা হয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, নিম্নচাপের প্রভাব থাকায় চলতি সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি হবে। ফলে আতঙ্ক বাড়ছে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

এ মাসে এখনও পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের খবর অনুযায়ী, ভাগলপুরে শুক্রবার গঙ্গার জলস্তর পৌঁছেছে ৩৬.৬২ মিটার। যা বিপৎসীমার থেকে ২.১২ মিটার ওপরে। তবে জলের স্রোত কিছুটা কমেছে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।

এ ছাড়াও ডুমরিয়া ঘাটে গণ্ডক, বলতারা ও কুরসেলা ঘাটে কোশী, খাগাড়িয়ায় বুড়ি গণ্ডক, গান্ধীঘাট, হাতিদহ, ভাগলপুর, কাহালগাঁও ও মুঙ্গেরে গঙ্গার জল বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গে বন্যায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালদা জেলা। প্রায় ১০ দিন ধরে ভাঙন ও বন্যার কবলে থাকা মালদার পরিস্থিতি শনিবার থেকে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গঙ্গার পানিতে ভাসছে ভূতনি চরের প্রায় ৭৮টি গ্রাম। গঙ্গার লাগাতার পানির স্তর বৃদ্ধিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে রতুয়া-১ নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা এবং বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৪৩টি গ্রামও। কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লকের বেশকিছু এলাকাতেও গঙ্গার পানি ঢুকে পড়েছে।

নতুন করে বন্যার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে ইংরেজবাজার ও কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকে। সব মিলিয়ে মালদায় বন্যায় বিপর্যস্ত প্রায় ৫ লাখ মানুষ। বন্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের।

রোববার বিপৎসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল গঙ্গার পানির স্তর। ফুলহরের পানি ছিল বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপরে। দুই নদীর পানির স্তরই এদিন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। গঙ্গায় লাল এবং ফুলহরে হলুদ সতর্কতা জারি রয়েছে।

ইতিমধ্যে অসংরক্ষিত এলাকাগুলোতে নদীর পানি ঢুকে পড়েছে। রয়েছে মালদা শহরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও। ১৯৯৮ সালে এই বাঁধ ভেঙেই গঙ্গার পানি মালদা শহর ভাসিয়ে দিয়েছিল। গঙ্গার পানির স্তর দ্রুত না নামলে এবারও কোনও বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।

ফরাক্কা ব্যারেজের ১০৯টি গেট গত বৃহস্পতিবার থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যারেজের ডাউনস্ট্রিমে থাকা গ্রামগুলিতেও এখন নদীর পানি ঢুকছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ফরাক্কা ব্যারেজের ১০৯টি গেট গত বৃহস্পতিবার থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যারেজের ডাউনস্ট্রিমে থাকা গ্রামগুলিতেও এখন নদীর পানি ঢুকছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফরাক্কা ব্যারাজের ১০৯টি গেট গত বৃহস্পতিবার থেকেই খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যারাজের ডাউনস্ট্রিমে থাকা গ্রামগুলিতেও এখন নদীর পানি ঢুকছে।

পার অনুপনগর গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, ‘এখনও পরিস্থিতি অতটা ভয়ংকর হয়নি। কারণ, মালদার দিকে থাকা ফরাক্কা ব্যারেজের গেটগুলো আংশিক খোলা রয়েছে। যদি গেটগুলো সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হয়, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির ছাদে পানি পৌঁছে যাবে। আমরা সতর্ক রয়েছি।’

প্রশাসন বলছে, বন্যা পরিস্থিতির ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশও সতর্ক রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলিতে এনডিআরএফ জওয়ানদের নিয়োগ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে। প্রত্যেক দুর্গত মানুষের কাছে সেই ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে কিছু দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে অসুবিধা হচ্ছে।

দুর্গতদের কাছাকাছি ফ্লাড শেল্টারে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, গবাদি পশু সঙ্গে থাকায় অনেকেই কোনও ফ্লাড সেন্টারে আশ্রয় নেননি। বন্যায় বিপর্যস্তদের একটি বড় অংশকে গবাদি পশুসহ বিভিন্ন উঁচু বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে দেখা গিয়েছে। সেখানে ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।