logo

যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়লে খাদ্যমূল্যে কী প্রভাব পড়বে

যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়লে খাদ্যমূল্যে কী প্রভাব পড়বে

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এই প্রথম বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এই দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর প্রভাবেই তেলের দামে হঠাৎ বড় উল্লম্ফন দেখা গেল। 

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এর বেশির ভাগই বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কারে করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৩৯ কিলোমিটার। প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। এই পরিমাণ তেল বিশ্বে মোট ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এ ছাড়া সমুদ্রপথে যে তেল বাণিজ্য হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। 

মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআিইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের তেল সরবরাহের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি পরিবহন করা হয় সমুদ্রপথে। প্রতিদিন প্রায় ৭৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। এই তেল পরিবহন মূলত কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। এই পথগুলোকে বলা হয় ‘চোকপয়েন্ট’। সমস্যা হলো, এসব পথের খুব বেশি বিকল্প নেই। ফলে কোথাও বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দ্রুতই ব্যাহত হতে পারে।

তেলের দাম কেন বাড়ছে?
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে হামলা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ফলে অনেক জাহাজের মালিক ঝুঁকি না নিয়ে হরমুজ প্রণালির প্রান্তে জাহাজ নোঙর করে যুদ্ধ থামার অপেক্ষা করছে। ফলে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ কমে গেলে এবং চাহিদা বাড়তে থাকলে দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। যার প্রভাব পড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

সোমবার (৯ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকেই।’ তার এই মন্তব্যের পর কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম সামান্য কমে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ওয়াশিংটন, তেলআবিব ও তেহরানের মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতির সমঝোতা না হলে তেলের উচ্চ দাম দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

কার্বনচেইনের সরবরাহ শৃঙ্খল বিষয়ক বিশ্লেষক ইসমাইল জাবিয়েভ আলজাজিরাকে বলেন, ‘মূল বিষয়টি হলো ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালি ও সস্তা ড্রোনের কথা ভাবুন। এখানে প্রত্যক্ষ অবরোধ নেই। ইরান সমুদ্রের ওপর দেয়াল তোলেনি। কিন্তু ঝুঁকি রয়েছে। সব ড্রোন ঘাঁটি ধ্বংস হলেও গোপনভাবে ড্রোন হামলা চালানো সম্ভব। তাই সংঘাত চলতে থাকলে সরবরাহ ব্যাহত হবেই।’

কোন দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল যায়, তার প্রায় ৮৯ শতাংশই এশিয়ার বাজারে পৌঁছে। প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথে তেল রপ্তানি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, সেই সুযোগ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরকে সংযুক্ত করে, যা হরমুজ প্রণালি এড়ানোর অন্যতম পথ। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেলই এই প্রণালি দিয়ে গেছে।

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাভেকাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলো সর্বোচ্চ অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল অন্যপথে পরিবহন করতে পারবে। কিন্তু তবুও যদি বেশির ভাগ ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

ইতিহাসে তেলের সর্বোচ্চ দাম কত ছিল?
বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময় তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০০৮ সালের ১১ জুলাই বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলারে ওঠে এবং মার্কিন মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১৪৭ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়। এর আগে ১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞা, ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সময়ও তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে ‍বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয়। যেখানে তেলের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হয়েছিল।

অপরিশোধিত তেল কীভাবে পেট্রোলে রূপান্তরিত হয়?
অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল হলো মাটির নিচ থেকে উত্তোলিত হলদে-কালো জীবাশ্ম জ্বালানি। এটি পরিশোধনাগারে নিয়ে গিয়ে পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়। একই প্রক্রিয়ায় এটি থেকে আরও বহু গৃহস্থালি পণ্যও তৈরি হয়।

তেলের ঘনত্ব ও সালফারের পরিমাণ অনুযায়ী এর মান নির্ধারণ করা হয়। ‘লাইট সুইট ক্রুড’-এ সালফার কম থাকে এবং এটি সহজে পরিশোধনযোগ্য, তাই এর মূল্য বেশি। 

একটি ব্যারেলে থাকে ১৫৯ লিটার ক্রুড অয়েল। পরিশোধনের পর একটি ব্যারেল থেকে সাধারণত প্রায় ৭৩ লিটার পেট্রোল পাওয়া যায়।

তেল ও গ্যাস থেকে কী কী পণ্য তৈরি হয়?
তেল ও গ্যাস শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এগুলো হাজারো দৈনন্দিন পণ্যের কাঁচামাল। প্লাস্টিক—যেমন পানির বোতল, খাদ্যপ্যাকেট, মোবাইল ফোনের কভার এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরিঞ্জ—সবই মূলত অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি।

পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকের মতো কৃত্রিম তন্তুও তেল থেকে তৈরি হয়, যা খেলাধুলার সময় ব্যবহৃত বিশেষ পোশাক থেকে শুরু করে কার্পেট পর্যন্ত নানা পণ্যে ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনী শিল্পেও পেট্রোলিয়ামজাত উপাদান ব্যবহৃত হয়—যেমন পেট্রোলিয়াম জেলি, লিপস্টিক ও কনসিলার।
এছাড়া কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট, থালাবাসন ধোয়ার তরল ও রং—এসব গৃহস্থালি পণ্যেও তেলভিত্তিক উপাদান রয়েছে।

বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও অনেকাংশে প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর, কারণ গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করা হয় কৃষিতে ব্যবহৃত সার।

তেলের দাম বাড়লে খাদ্যের দাম কেন বাড়ে
তেলের দাম ও খাদ্যের দাম প্রায় একইসঙ্গে ওঠানামা করে। কারণ ক্ষেতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে ট্রাকে করে খাবার পরিবহন পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির প্রভাব রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও সরাসরি বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো পরিবহন। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া, এটাই মূল বিষয়। এটি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিকসের সমস্যা, আর পরিবহনই হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির জ্বালানি।’

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন—তেলের বাজারে বড় ধাক্কার পর ইতিহাসে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে। কারণ এসব দেশে মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্যে এবং অনেক দেশকে বিপুল পরিমাণ শস্য ও সার আমদানি করতে হয়। এসব কারণে তেলের দাম বাড়লে সেখানে খাদ্যসংকট দ্রুত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখকদ্বয়: আলজাজিরার সাংবাদিক

আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘হাউ উইল সোয়ারিং অয়েল প্রাইসেস কজড বাই ইরান ওয়ার ইমপ্যাক্ট ফুড প্রাইসেস?’ শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]