logo
Advertisement

ফ্রান্সের রাজপথে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হলো ১৫ শতকের ইতিহাস

সাইফুল ইসলাম রনি
সাইফুল ইসলাম রনিফ্রান্স
ফ্রান্সের রাজপথে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হলো ১৫ শতকের ইতিহাস
ফ্রান্সের প্যারিসে ঐতিহাসিক পোশাকে সজ্জিত কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একদিকে ভাইকিং যোদ্ধা, অন্যদিকে মধ্যযুগের রাজদরবার। কোথাও সম্রাট নেপোলিয়নের সৈন্যদল, কোথাও বিংশ শতকের সাংস্কৃতিক আইকন জোসেফিন বেকার।

ইতিহাসের বইয়ের পাতায় থাকা এমন বহু চরিত্রই যেন হঠাৎ নেমে এল প্যারিসের রাজপথে। পোশাক, সংগীত, অভিনয় ও ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে রাজধানী প্যারিসে জীবন্ত হয়ে উঠল প্রায় ১৫ শতকের ইতিহাস।

১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ‘লা ফেত দ্য প্যারিস’ ২০২৬ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল এই বিশাল ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজ। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এতে অংশ নেন ১ হাজারের বেশি শিল্পী ও ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়কারী, ৬০টির বেশি কারুশিল্পী এবং প্রায় ২৫০ স্বেচ্ছাসেবক। দুই দিনের আয়োজনে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫৮ হাজার বলে জানিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় প্যারিসের প্যানথিওন থেকে শুরু হয় গ্র্যান্ড প্যারেড হিস্টোরিক। ঐতিহাসিক পোশাকে সজ্জিত প্রায় এক হাজার অংশগ্রহণকারী প্যারিসের বিভিন্ন সড়ক অতিক্রম করেন। প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই শোভাযাত্রায় কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়।

পঞ্চম শতকে সাঁত জেনেভিয়েভের হাতে প্যারিস রক্ষার ঐতিহাসিক কাহিনি থেকে শুরু করে ভাইকিংদের আক্রমণ, মধ্যযুগের রাজা লুই নবম, পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ন-এর যুগ, উনিশ ও বিশ শতকের প্যারিস এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার প্যারিসের মুক্তি—সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা যায় এই মহাযাত্রায়।

২০২৬ সালের আয়োজনের অন্যতম বিশেষ দিক ছিল কিংবদন্তি শিল্পী ও ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জোসেফিন বেকারকে ঘিরে শ্রদ্ধা নিবেদন। সংগীত, নৃত্য ও মঞ্চ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীজীবন ও প্যারিসের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা স্মরণ করা হয়।

এবারের উৎসবের আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ১৮৭৬ সালের প্যারিস। সে সময়ের জনপ্রিয় থিয়েটার, বিনোদন ও নগরজীবনের আবহ পুনর্নির্মাণে আয়োজন করা হয় ঐতিহাসিক গ্রাম ও বিভিন্ন প্রদর্শনী।

ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজের পাশাপাশি দেখানো হয় ঐতিহাসিক গ্রাম। সেখানে ছিল কারুশিল্প, স্থানীয় উৎপাদক, ঐতিহ্যবাহী খাবার, সংগীত, মঞ্চ পরিবেশনা এবং ঐতিহাসিক যুদ্ধের প্রদর্শনী। সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় গিনগুয়েট, সুইং সংগীত ও নৃত্যের অনুষ্ঠানও।

আয়োজকদের মূল লক্ষ্য শুধু বিনোদন নয়, প্যারিসের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে পৌঁছে দেওয়া। এজন্য ইতিহাসকে বক্তৃতা বা জাদুঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে রাস্তায় নামানো হয়েছে।

একজন দর্শক একই কুচকাওয়াজে মধ্যযুগের যোদ্ধা, রাজা, সম্রাট, শিল্পী ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরিত্র দেখতে পারেন। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্যারিসের কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এই আয়োজনের পেছনে কাজ করেছে ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন, ঐতিহ্যপ্রেমী ক্লাব এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

‘লা ফেত দ্য প্যারিস’ এখন প্যারিসের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সংস্করণেও প্রায় ৫৮ হাজার উৎসবপ্রেমী অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের আয়োজনকে আরও বড় পরিসরে সাজানো হয়।

বিশেষ আকর্ষণ হলো, উৎসবটির প্রধান আয়োজনগুলো সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত। ফলে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিনোদনের এই সমন্বিত আয়োজন শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয় পরিবার, শিশু-কিশোর ও ইতিহাসপ্রেমীদেরও আকৃষ্ট করছে।