যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে হরমুজে এখন পর্যন্ত যে চিত্র দেখা গেল

আরব সাগরে দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধ। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাত আটটার পর থেকে অবরোধ শুর করে যুক্তরাষ্ট্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধের শুরু থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলে এ অবরোধ বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ এ পথে জাহাজ চলাচলে যতটা বাধার মুখোমুখি হওয়ার আশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। তবে দ্বিতীয় দিনে (বুধবার) এসে কিছুটা কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
মঙ্গলবার (১৪) রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বার্তা সংস্থা আনাদুলো জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকে মোট ২৫টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করেছে। আরও ১৩টি জাহাজ প্রণালি এলাকায় অবস্থান করছে। অবরোধ উপেক্ষা করে পার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি ট্যাংকার ছিল। এগুলোর মধ্যে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘ক্রিশ্চিয়ানা’, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত ‘রিচ স্টারি’ ও ‘মুরলীকিষাণ’ এবং পানামার পতাকাবাহী ‘পিস গালফ’ উল্লেখযোগ্য। তবে এসব ট্যাংকার গোয়াদর উপসাগর ও রাস আল হাদ্দের কাছাকাছি মার্কিন অবরোধ রেখার সামনে এসে থেমে থাকতে দেখা গেছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে এ অবরোধের প্রভাব এ পর্যন্ত কেমন দেখা গেছে তা এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলা—
১৩ এপ্রিল
য়ুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত আরব সাগরে নৌ অবরোধ প্রথমে ভঙ্গ করে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে চীনের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজ। ফলে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত আটটায় শুরু হওয়া এই অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এমনকি চীনের এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কারণ ট্যাংকারটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল।
মাঝারি পাল্লার এই ট্যাংকারের নাম ‘রিচ স্টারি’। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ার আগে নাম ছিল ‘ফুল স্টার’। সে সময় তেহরানকে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করার অভিযোগ কালো তালিকাভুক্ত করে ওয়াশিংটন। জাহাজটি আপাতত পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাউইয়ের পতাকার অধীনে চলাচল করছে। কিন্তু আফ্রিকান দেশটি বলেছে, সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই।
এর প্রতিক্রিয়ায় এই ঘটনার পর ইরান থেকে চীনের তেল আমদানির পথ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ওয়াশিংটন ডিসিতে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, ইরান থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না চীন। হরমুজ প্রণালিতে তারা ইরানি তেলবাহি ট্যাংকারগুলোকে বাধা দেবে। চীন অন্য তেল পেতে পারে, কিন্তু ইরানি তেল না।
১৪ এপ্রিল
বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) অন্তত আটটি জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধ আরোপের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজ অবরোধ ভাঙতে পারেনি। এ সময়ের মধ্যে ইউএস নৌবাহিনীর নির্দেশে ছয়টি জাহাজ মুখ ঘুরিয়ে ইরানি বন্দরে ফেরত গেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ অতিক্রম করা ইরান-সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজের কোনোটিই ইরানের বন্দরে যাচ্ছিল না। তাই জাহাজগুলোকে অবরোধের শর্ত ভঙ্গের মধ্যে ধরেনি যুক্তরাষ্ট্র।
পিস গালফ নামের একটি মাঝারি আকারের ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা এলএসইজি। পানামার পতাকাবাহী নৌযানটির গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দর। ট্যাংকারটি সাধারণত ইরানের পেট্রো-কেমিকেলের কাঁচামাল (ন্যাফথা) এশিয়ার দেশগুলোয় রপ্তানি করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বন্দরে পরিবহন করে থাকে। তবে ইরানে ইরানে পরিবহন করে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা দুটি ট্যাংকারও ওই প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। একটি জাহাজ ‘মারলিকিশান’। কেপলারের তথ্যমতে, জাহাজটিতে বর্তমানে কোনো পণ্য নেই। আগামীকাল ১৬ এপ্রিল ইরাক থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার কথা রয়েছে জাহাজটির। তবে অতীতে এটি রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহন করেছে।
১৫ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্রের কঠোরতা কেমন দেখা যাচ্ছে
অবরোধ শুরু হওয়ার পর এবং মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তেমন একটা কার্যকর হতে দেখা যায়িনি। তবে দ্বিতীয় দিনে এসে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকালে ইরানের বন্দর ছেড়ে আসা এবং সেখানে প্রবেশের চেষ্টাকারী অন্তত আটটি তেলবাহী জাহাজকে গতিরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। পরে জাহাজগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব সাগরের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইউএস নৌবাহিনীর সদস্যরা রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোর ক্রুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। খবর পেয়ে হরমুজ পাড়ি দিতে চাওয়া আজ কিছু জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নৌবাহিনীর সদস্যরা।
অবরোধের সঙ্গে সঙ্গে সবকয়টি ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজ ইউএস নৌবাহিনীর নির্দেশ মেনে নিয়েছে। ফলে কোনো জাহাজেই তল্লাশি চালানোর জন্য ওঠার (বোর্ডিং) প্রয়োজন পড়েনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর তাদের অবরোধ কার্যকর করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো অবরোধের আওতাভুক্ত জাহাজগুলো যখন ইরানের স্থাপনা ত্যাগ করে এবং হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে উন্মুক্ত জলসীমায় আসে, তখন সেগুলোকে আটকে দেওয়া এবং পুনরায় ফিরে যেতে বাধ্য করা।