logo

কেন খারগ দ্বীপ দখলে নেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভুল

কেন খারগ দ্বীপ দখলে নেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভুল

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে বিতর্ক তুঙ্গে। প্রস্তাবটি হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করা। রক্ষণশীল মার্কিনিরা এই পদক্ষেপকে ইরানের অর্থনীতির কণ্ঠনালি চেপে ধরার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মত দিয়েছেন, খারগ দ্বীপ দখল করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভুল। 

নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেনসসহ কিছু রক্ষণশীল বিশেষজ্ঞের মতে, খারগ দ্বীপটি আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের রাজস্বের প্রধান উৎসটি কব্জা করতে পারবে। এতে তেহরান তার সৈন্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়ার সক্ষমতা হারাবে। 

তবে এই ধারণাটি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপ। দেশটির তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই ছোট চুনাপাথরের মালভূমি দিয়ে প্রবাহিত হয়। যখনই কোনো ট্যাংকারের ইরানি অপরিশোধিত তেল লোড করার প্রয়োজন হয়, তখন তারা খারগে যায়। এটি কোনো সন্দেহ ছাড়াই ইরানি অর্থনীতির ‘কণ্ঠনালি’। আর ঠিক এ কারণেই কট্টরপন্থিরা একে একটি আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর পরিণাম যে কোনো সামরিক অভিযানের চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

মার্কিনিদের এই পরিকল্পনার মূল আকর্ষণ বোঝা সহজ। তাদের ধারণা, এই একটিমাত্র পয়েন্ট দখল করতে পারলে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রাথমিক উৎস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর এর মাধ্যমে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতো যারা দরকষাকষিতে বিশ্বাসী, তাদের কাছে এই পরিকল্পনার পেছনে নিশ্চয় কোনো নিষ্ঠুর যুক্তি আছে।

কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। তা হলো- আগের কোনো সংঘাতে (এমনকি আট বছরের দীর্ঘ ইরান-ইরাক যুদ্ধেও) খারগ কেন ধ্বংস হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার যুদ্ধ শুরুর দিন সকালে এক রেকর্ড করা বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিন। বিজয় আপনাদেরই হবে।’ 

যুদ্ধের পর যে সরকারই আসুক না কেন, ইরানের তেল রপ্তানির সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করা পরবর্তী সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। এ ছাড়া বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ প্রভাব বিপর্যয় ডেকে আনবে।

কেউ যদি এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিকে আপাতত সরিয়েও রাখেন, তবে কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিকল্পনাটি ত্রুটিপূর্ণ। খারগ দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের দখলে যাওয়া মানেই যে ইরানকে দমন করা যাবে, এই ধারণাটি যখন বাস্তব পরিস্থিতির মুখে পড়ে, তখন তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। 

দখল সহজ, কিন্তু রক্ষা করা অসম্ভব

খারগ দ্বীপ আকারে ছোট এবং সমতল। আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের অর্ধেকেরও কম। এই হিসেবে দ্বীপটিতে মোতায়েন করা ইরানি বিপ্লবী গার্ডসের (আইআরজিসির) সৈন্য সংখ্যা খুবই সামান্য। যেসব সৈন্য মোতায়েন আছে তারাও মূলত তেল অবকাঠামো পরিচালনা এবং আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত। এ কথা সত্য যে, এই বাহিনী একটি পূর্ণাঙ্গ আমেরিকান আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম নয়, আর ইরানি নৌবাহিনীর পক্ষেও তাদের সাহায্য করা সম্ভব নয়।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী, এয়ারবর্ন ব্রিগেড বা মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের পক্ষে এই দ্বীপ দখল করা খুবই সহজ। দ্বীপটির সমুদ্রসৈকতগুলো খুব একটা সুবিধাজনক না হওয়ায় মার্কিন সেনারা মূলত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে অবতরণ করবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, খারগ দখল করা কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা শুরু হবে দ্বিতীয় দিন থেকে এবং এরপর প্রতিদিন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের টিনিয়ান দ্বীপের সঙ্গে খারগের তুলনা করা হলেও তফাত অনেক। টিনিয়ান শত্রুপক্ষ থেকে দেড় হাজার দূরে ছিল, কিন্তু খারগ ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ১৫ মাইল দূরে। এটি সরাসরি ইরানি কামান, রকেট, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন আর্সেনালের আওতায় রয়েছে। টিনিয়ানে জাপানিরা গোলাবর্ষণ করতে পারেনি, কিন্তু খার্গের কোনো বাফার জোন বা নিরাপত্তা দূরত্ব নেই। এই সবকিছু মিলিয়েই মূলত ইরানের শক্তিমত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার সংমিশ্রণ।

আমেরিকার সেনাবাহিনী সেখানে পা রাখা মাত্রই ইরানের লক্ষ্য হবে দ্বীপটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা। যেহেতু কৌশলগত সম্পদটি তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তাই তাদের যৌক্তিক পদক্ষেপের অগ্রাধিকার হবে দ্বীপটি ধ্বংস করে দেওয়া। যেন সামরিক রসদ খরচ করে হাতিয়ে নেওয়া দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। মাত্র ৭ দশমিক ৫ বর্গমাইলের এই দ্বীপে মার্কিন সেনাদের পালানোর কোনো জায়গা থাকবে না। নর্মান্ডি যুদ্ধের মতো এখানে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই; এখানে শুধু খারগই আছে। মার্কিন সেনারা এমন একটি জায়গায় আটকা পড়বে যেখান থেকে তারা বের হতে পারবে না এবং ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হবে।

পাশাপাশি আরও আশঙ্কা হচ্ছে, মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে। তাদের প্যাট্রিয়ট বা থাড সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল একটি সীমিত সম্পদ। খারগ রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিটি মিসাইল খরচ করা মানে অন্য কোনো জায়গার নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়া। ইরান এই হিসাবটি খুব ভালো করেই জানে।

এটি যেন কেবল অলস জল্পনা হয়

সাম্প্রতিক ট্রাম্পের কিছু নতুন পদক্ষেপে ধারণা হচ্ছে এই যুদ্ধ কেবল বিমান হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে উচ্চ সতর্কবার্তা এবং প্রশিক্ষণ মহড়া থেকে ইউনিটগুলোকে ফিরিয়ে আনা। স্পষ্ট বিষয় হলো, ইরানে স্থল অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তাই খারগ দ্বীপে একটি অভিযান চালানো কল্পনা করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু যা কল্পনা করা যায়, তা-ই যে বুদ্ধিমানের কাজ হবে, এমন নয়।

সহজ কথায়, খারগ দ্বীপ দখলের সুফলের চেয়ে কুফল বা খরচ অনেক বেশি। আমেরিকান সেনাসদস্যরা সেখানে একটি উন্মুক্ত মৃত্যুফাঁদে আটকা পড়বে। পাশাপাশি দ্বীপের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় বিশ্ব তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এই পরিকল্পনা যদি সম্পাদকীয় পাতার জল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরানি ভূখণ্ডে সশরীরে যুদ্ধের ময়দানে জড়িয়ে পড়বে। এর মধ্য দিয়ে কোনো সাময়িক অভিযান নয়, বরং অবিরাম আক্রমণের মুখে এক অনির্দিষ্টকালের দখলদারিত্বে পরিণত হবে।

এই যুদ্ধ আদতে কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না। যদি যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপ দখলে নেয় তাহলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হবে। এখন যুদ্ধ কমানোর পথ খোঁজা উচিত, উত্তেজনা বাড়ানোর পথ নয়।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) কনসার্নড ভেটেরানস ফর আমেরিকা আয়োজিত একটি প্যানেল আলোচনার ভিত্তিতে এই নিবন্ধটি সাবস্ট্যাক-এ সম্পাদনা করা হয়েছে।