logo

যারা মনে করেন ট্রাম্প ইরানে শান্তি ফেরাতে চান, তাদের জন্য এই লেখা

যারা মনে করেন ট্রাম্প ইরানে শান্তি ফেরাতে চান, তাদের জন্য এই লেখা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধে তাকে যথেষ্ট সহায়তা না করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দুই দেশের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে, আপনি তাকে সহায়তা করলেও তিনি এমন ভাব করবেন, যেন কিছুই করা হয়নি। এমনকি তিনি আপনার যুদ্ধাহত বা নিহত সৈন্যদের প্রতি অসম্মানও দেখাতে পারেন। তবু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব একটি টাইমশেয়ার বিক্রির মতো। আমেরিকানদের কাছ থেকে এই প্রস্তাব আরও লোভনীয় লাগতে পারে।

ইরান প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রুশিয়ান সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লজেভিৎস বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ অনিশ্চয়তার ক্ষেত্র।’ একটু অশালীন শোনালেও—আমি এখনও মনে করি ক্লজেভিৎস মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী সামরিক চিন্তাবিদ ছিলেন। অন্তত তার শরীরে ক্রুসেডের ট্যাটু এতগুলো ছিল না।

হেগসেথ তার অবস্থান নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত, এমনকি যখন সেগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক হয় তখনও। এটাও লক্ষণীয়, তিনি, মার্কো রুবিও এবং জেডি ভ্যান্স—এই যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে এরই মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অথচ এই প্রশাসন ক্ষমতায় এসেছিল কোনো যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, এটি কোনো শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়। আপনি যদি বিষয়টি মেলাতে না পারেন—করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনির কমপাউন্ড ধ্বংস হওয়ার কয়েক মিনিট পরই যখন এই দাবি করা হয়েছিল—হেগসেথ পরে আবারও বলছেন, ‘ইরানে যা চলছে তা কোনো জাতি গঠনের চেষ্টা নয়, কোনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প নয়।’

অবশ্যই নয়। কেননা, ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা নিজেদের দেশেই গণতন্ত্রকে খুব একটা পছন্দ করেন না, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত অপদার্থ দেশগুলোর জন্য তারা সেটি চাইবেন, এমনটা আশা করার কারণও নেই। একে বরং ‘রেজিম-রিফ্রেশ’ যুদ্ধ বলা যেতে পারে। আয়াতুল্লাহ বদলালেও হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে পার্থক্য বোঝা কঠিন হবে। তবে নতুন নেতা সম্ভবত ভেনেজুয়েলার কোনো পুতুল সরকারের মতো আচরণ করবেন। নারীর অধিকার বা স্বাধীনতার প্রশ্নে কী হবে জানি না, তবে ধারণা করা যায় সেগুলো ‘পরে দেখা যাবে’।

দুঃখজনকভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের মান এখন এতটাই হালকা হয়ে গেছে যে, এ ধরনের বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে আগেই বলে নিতে হয়, ‘আমি কিন্তু স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের পক্ষে।’ কারণ কিছু মানুষ সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করে বসেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও যারা গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে ক্ষুব্ধ ছিলেন, তারা এখন ট্রাম্পকে নায়ক হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন হলো, একজন নেতার কাছ থেকে বারবার হতাশ হওয়ার পরও মানুষ কতবার ‘আরেকবার’ বিশ্বাস করতে পারে?

আমি সত্যিই চাই ইরানের মানুষ স্বাধীনতা পান। বিশেষ করে সেই নারীরা, যারা কঠোর নিপীড়নের মধ্যে বাস করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে কার্যত কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই। এর ওপর ট্রাম্প প্রায় সব বিষয়েই অতিরঞ্জিত বা অসত্য বক্তব্য দেন। যদি তিনি সত্যিই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেন, তেহরানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন থামাতে পারেন এবং চার সপ্তাহের মধ্যে একটি অনুকূল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যেমনটি তিনি দাবি করেছেন—তাহলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয় হবে। কিন্তু বাস্তবে এর সম্ভাবনা কতটা? বরং অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে যে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি তৈরি হবে। গাজায় হত্যাযজ্ঞকে সমর্থনের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব থাকতে পারে দশকের পর দশক; এবং তার ইঙ্গিত এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

এদিকে গত কয়েক দিনের আরেকটি ঘটনা হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করেছে, কারণ প্রতিষ্ঠানটি তাদের নীতিমালা শিথিল করতে রাজি হয়নি। তারা তাদের প্রযুক্তি ‘গণ-নজরদারি’ বা স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতি অস্ত্রে ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন এ নিয়ম পরিবর্তন করতে বলেছিল। অ্যানথ্রোপিক রাজি না হওয়ায় তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয় এবং বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে নেওয়া হয়।

সেই বিকল্প সরবরাহকারী হলো স্যাম অল্টম্যানের প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। শুরুতে তিনি দাবি করেছিলেন, তার চুক্তিতেও একই ধরনের নৈতিক সীমারেখা থাকবে। কিন্তু যদি সত্যিই অল্টম্যানের প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের মতো কঠোর থাকতো, তাহলে প্রতিষ্ঠান দুটির পরিণতি হতো। কারণ, সম্ভবত বাস্তবে তাদের সীমারেখা সমান নয়। অল্টম্যানের ক্ষেত্রে প্রায়ই যেটা হয়, বিষয়গুলো প্রথমে যেমন মনে হয়, বাস্তবে তেমন নয়। আর সত্যিটা বুঝতে অনেক সময় খুব দেরি হয়ে যায়।

এই অজানা ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক প্রযুক্তি নিয়ে সুস্পষ্ট নীতি তৈরির পরিবর্তে ট্রাম্প যেন মধ্যপ্রাচ্যে বোমা ফেলার পুরোনো কৌশলে ফিরে গেছেন। ‘আর কোনো যুদ্ধ নয়’ বলে ক্ষমতায় আসা একজন নেতার জন্য এই কর্মকাণ্ড ভয়াবহ রকমের সাংঘর্ষিক।

অনেকে মনে করেন, তিনি বিশ্বব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে পুনর্গঠন করছেন। কিন্তু অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, পশ্চিমা বিশ্বের জীবনধারার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো তিনিই করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের অভাবের কথা বাদ দিলেও প্রশ্ন থাকে, তিনি কি নিজ দেশেই গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দেন? তিনি কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিপজ্জনক প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়তে দিচ্ছেন না? তিনি কি আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক দুর্বল করেননি? আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতায় থাকাকালীন এত প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করেছেন?

তিনি যেমন বিশ্ব পেয়েছিলেন, ক্ষমতা ছাড়ার সময় কি তারচেয়ে বেশি নিরাপদ একটি বিশ্ব রেখে যাবেন?

লেখক: ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের কলামিস্ট

গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘টু এনিওয়ান হু থিংকস ট্রাম্প ক্যান ব্রিং পিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি টু ইরান—আই’ভ গট আ ব্রিজ টু সেল ইউ। গোয়িং চিপ’ শীর্ষক কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]