ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের প্রস্তুতি, মাখোঁ সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের প্রস্তুতি চলছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারি খাতের কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে শিক্ষা, রেল ও গণপরিবহনসহ বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সরকারের জন্য এটি নতুন এক বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বামপন্থি শ্রমিক সংগঠন সিজিটি সহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোও সমর্থন জানিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
সিজিটি প্রধান সোফি বিনে এলসিআই টেলিভিশনকে বলেন, ‘আজ রাজপথে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।’
গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। এ ঘটনায় ম্যাক্রোঁ সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়।
নতুন করে সহিংসতা এড়াতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভে ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ মানুষ অংশ নিতে পারেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষক বৃহস্পতিবারের ধর্মঘটে অংশ নিতে পারেন। এ ছাড়া রেল ও গণপরিবহন সেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট কমে যায়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে শিক্ষার্থীদেরও। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশের অবনতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থী ইরমা দ্য বানভিল বলেন, ‘আমরা যতটা সম্ভব আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে অনেকে ভয়ে অংশ নিচ্ছে না। পুলিশের সহিংসতা নিয়ে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে।’
অন্যদিকে, ফরাসি সরকার পুলিশের ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাখোঁর তৎপরতা
বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভের আগে বুধবার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। শুরুতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে আন্দোলন শুরু হলেও তা এখন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
মাখোঁর ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের লক্ষ্য হলো উপচে পড়া নদীকে আবার তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে আনা এবং যতটা সম্ভব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা।’
চলতি সপ্তাহে আগের তুলনায় কমসংখ্যক উচ্চবিদ্যালয়ে অবরোধ থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে বলে মনে করছে সরকার।
গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি নীতি এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়িয়ে রেখেছে। বিরোধী দলগুলোও সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ইডিএফ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের ধর্মঘটে ফ্রান্সের বিদ্যুৎ খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোও অংশ নেবে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বিদ্যুৎ খাতের ধর্মঘটে দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গিয়েছিল। একই সঙ্গে ফ্রান্সের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ডানকার্ক এলএনজির সরবরাহ সক্ষমতাও কমে যায়।
সব মিলিয়ে নতুন এই বিক্ষোভ ও ধর্মঘট ফ্রান্সের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি এবং মাখোঁ সরকারের নেতৃত্বের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
