logo

লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, কোন পথে ইরান যুদ্ধ

লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, কোন পথে ইরান যুদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের প্রচেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খেল। লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার না করায় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে।

তেহরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে যুদ্ধ থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, সেখানে দুই পক্ষের এমন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান শুরু থেকেই শর্ত দিয়ে আসছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তির প্রধান ভিত্তি হতে হবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি। ইসরায়েল যদি লেবাননে হামলা বন্ধ না করে তবে তেহরানও এই যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

এই উত্তেজনার মাঝে হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে হওয়া শান্তি চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেন। উল্লেখ্য, এই চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়ায় হিজবুল্লাহকে কোনো পক্ষ করা হয়নি। তবে এই প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে এখনও ইসরায়েল, লেবানন বা আমেরিকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চুক্তি নিয়ে জটিলতা চললেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী কোনোভাবেই দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটবে না এবং সামরিক অভিযানও বন্ধ হবে না।

গত মার্চ মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সমান্তরালে লেবাননেও আগ্রাসন চালায় ইসরায়েল। এই পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালে হিজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতারা অর্থাৎ ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের কুদস ফোর্সের কমান্ডার দাবি করেছেন, শান্তি চাইলে ইসরায়েলকে অবশ্যই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা বলা হলেও চলতি সপ্তাহে লেবানন, গাজা, উত্তর ইসরায়েল এবং কুয়েতের সাধারণ মানুষ ক্রমাগত হামলার শিকার হয়েছেন।

এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার (৩ জুন) মন্তব্য করেছেন, এই চুক্তিগুলোর অর্থ লড়াই সম্পূর্ণ বন্ধ করা নয়, বরং আরও মাঝারি উপায়ে বা কম তীব্রতায় গুলি চালানো।

এরইমধ্যে বুধবার পারস্য উপসাগরে মার্কিন ও ইরানি বাহিনী একে অপরের ওপর তীব্র হামলা চালিয়েছে, যা গত এপ্রিলের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত। ইরানি হামলায় কুয়েত বিমানবন্দরে একজন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এর জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত হরমুজ প্রণালির কাছে পাল্টা বোমাবর্ষণ করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ রয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের তেল রপ্তানি গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। তবে লেবাননের যুদ্ধবিরতি হয়তো শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানকে যুদ্ধের মাঠ থেকে কূটনৈতিক টেবিলে ফিরিয়ে আনবে—এমন আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। যদিও ট্রাম্প গত মার্চের শেষ দিক থেকে দাবি করে আসছেন, একটি বড় চুক্তি খুব কাছাকাছি রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক অগ্রগতির তেমন কোনো প্রমাণ মিলছে না।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর জন্য ট্রাম্প নিজের দেশে তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন। এমনকি গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে একটি বিল পাস হয়। এ ঘটনায় ট্রাম্পকে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। যদিও বিলটি প্রতীকী এবং ট্রাম্প এটি স্বাক্ষর করে আইনে পরিণত করবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দাবি করেছেন, ইরানের শত্রুরা ইতোমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে এখন দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি ইরানে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

তেহরানের মূল দাবি হলো—আটকে থাকা শত কোটি ডলারের তেল রাজস্বের ছাড়পত্র, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা, যদিও ইরান সবসময় দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা বৃহস্পতিবার এক রিপোর্টে জানিয়েছে, গত তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি।

সূত্র: রয়টার্স