ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ ট্রাম্পের

ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প। যদিও এর আগে তিনি শান্তি চুক্তি চূড়ান্তের পথে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
আলোচনার অংশ হিসেবে দুই দেশের খসড়া চুক্তিতে নতুন করে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার একটি রূপরেখা তৈরি করা। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে এগিয়ে চলছে। তবে কোনো ভুল এড়াতে উভয় পক্ষকেই পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বিষয়টি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
শনিবার (২৩) ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘চুক্তির বেশিরভাগ বিষয় চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’ তার এ মন্তব্যে ধারনা করা হচ্ছিল, যে কোনো মুহূর্তে চুক্তির বিষয়ে হয়তো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। একই সুর শোনা গেছে ইরানি কর্মকর্তাদের কণ্ঠেও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, দুই পক্ষ কিছু চুক্তির বিষয়ে খুব কাছকাছি অবস্থানে রয়েছে, তবে আরও কিছু বিষয়ে এখনও আলোচনার বাকি অনেক দূর।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের দাবি, যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে তা কোনো স্থায়ী নাও হতে পারে। এই আলোচনার মাধ্যমে জটিল বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ করে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ফেরত দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্তাবলি।
রোববার (২৪ মে) রাতে এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তেহরানকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে কোনোভাবেই তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। অবশ্য ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক বোমার উপযোগী ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা সময়ের ব্যাপার। অবশ্য এই আশঙ্কার জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। ইরান বিশ্ববাসীকে এই নিশ্চয়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ফলে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। তবে এটি এখনও কোনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
ইরানের মুখপাত্র বাঘাই জানিয়েছেন, তারা মূলত একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার কাজ করছেন। পরবর্তীতে চূড়ান্ত চুক্তির পথ সুগম করবে। ট্রাম্পও তার পোস্টে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি (২৫ মে) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের ভেতরে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দলের অনেক নেতা মনে করছেন এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। সিনেটর টেড ক্রুজ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘বিপর্যয়কর ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার অর্থ হলো— অপারেশন এপিক ফিউরির মাধ্যমে অর্জিত সব সাফল্যকে পানিতে ফেলে দেওয়া। তবে ভিন্ন কথা বলেছেন হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য মাইক ললার। তার মতে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন সফলভাবে ইরানকে একটি বাস্তবসম্মত আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে পেরেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলা ও নেতাদের হত্যার জবাবে ইরানও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত চালায়। একইসঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ত্যব্র অস্থিরতা দেখা দেয়।
পরবর্তীতে এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। যতক্ষণ না একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে ততক্ষণ এই বন্দর অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
