logo

ইয়েমেনে তীব্র খাদ্যসংকট, প্রতি চার পরিবারের তিনটিই অনাহারে: জাতিসংঘ

ইয়েমেনে তীব্র খাদ্যসংকট, প্রতি চার পরিবারের তিনটিই অনাহারে: জাতিসংঘ
ইয়েমেনের এডেন শহরের পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-ফিরদাউস ক্যাম্পে বাস্তুচ্যুত এক ইয়েমেনি বালক রুটি বহন করছে। ছবি: এপি

ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ায় বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা। এর ফলে দেশটির সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব এমন এলাকাগুলোতে প্রায় চারটির মধ্যে তিনটি পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগাড় করতে পারছে না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

শুক্রবার ডব্লিউএফপি জানায়, এসব এলাকার ৭৪ শতাংশ পরিবার তাদের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। চলতি বছরে এটাই সর্বোচ্চ হার। সংস্থাটির হিসাবে, সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে প্রায় ১ কোটি মানুষ বসবাস করছে।

খাদ্যসংকটের এমন অবনতি ঘটছে এমন একটি দেশে, যেখানে প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি গোষ্ঠীর মধ্যে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় লড়াই বেড়েছে। হুতিরা দেশটির রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ডব্লিউএফপির কর্মসূচি পরিচালনা বিভাগের সহকারী নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ হলিংওয়ার্থ সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতের সাম্প্রতিক তীব্রতা ইয়েমেনের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী হলে বর্তমান পরিস্থিতি বড় ধরনের ক্ষুধা সংকটে রূপ নিতে পারে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা বহু বাস্তুচ্যুত পরিবার এডেনের আশপাশ ও তাইজ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। এসব পরিবারের অনেকেরই পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই।

সহায়তায় অর্থসংকট

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ ১৫ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে ডব্লিউএফপি। তবে এই কার্যক্রম চালাতে সংস্থাটির অতিরিক্ত ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার প্রয়োজন।

ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে নভেম্বরে খাদ্য বিতরণের জন্য বরাদ্দ অর্থ ও সম্পদের একটি অংশ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থায়ন না এলে এক মাসের মধ্যেই বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

সংস্থাটির হিসাবে, পুরো ইয়েমেনে বর্তমানে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

আঞ্চলিক বাণিজ্যেও প্রভাবের আশঙ্কা

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সীমান্তপারের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিকে ওই সময়ের পর সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলমান সংঘাত ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হলিংওয়ার্থ সতর্ক করে বলেন, হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাব আল-মানদাব প্রণালি এবং ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালির আশপাশে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এরই মধ্যে সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ইয়েমেন থেকে পালিয়ে বাব আল-মানদাব প্রণালি অতিক্রম করে ৩ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ জিবুতিতে পৌঁছেছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য বলছে, ইয়েমেনে ১ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের অনেকেই নিরাপত্তার জন্য একাধিকবার ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।