logo

খামেনির মৃত্যু, কেমন হতে পারে ভবিষ্যৎ ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো

খামেনির মৃত্যু, কেমন হতে পারে ভবিষ্যৎ ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর জোর আলোচনা শুরু হয়েছে দেশটির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন দেশটিতে দ্রুত সরকার পতনের সম্ভাবনা দেখছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে সৃষ্ট এই রাজনৈতিক শূন্যতা ইরানে আরও কঠোর ও সামরিকীকৃত নেতৃত্বের জন্ম দিতে পারে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের নেতৃত্বের ওপর এটিই সবচেয়ে বড় আঘাত। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। রুহুল্লাহ খোমেনির প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়ন করেন আয়াতুল্লাহ খামেনি।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা করেন, তার এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইরানের দায়িত্ব ও ন্যায্য অধিকার।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, তারা কোনো চুক্তি আদায়ের জন্য সামরিক চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং তারা ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চায়। দেশ দুটি ধরেই নিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত ইরানে একটি সহজ জয় লাভ করবে।

তবে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি হয়তো এতটা সহজ হবে না। সাবেক মার্কিন উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় মনে করেন, স্থলবাহিনী বা সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছাড়া কেবল বিমান হামলায় সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের গভীর নিরাপত্তা কাঠামো যদি ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে শীর্ষ নেতৃত্ব মারা গেলেও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের স্থিতিস্থাপকতার কারণ হলো দ্বৈত সামরিক কাঠামো। একদিকে নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘আরতেশ’, অন্যদিকে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যা ‘ভেলায়াত-এ ফকিহ’ রক্ষা করে। এদের সহায়তায় আছে বিস্তৃত স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’, যারা আবার অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমন ও কর্মী সংগঠনে প্রশিক্ষিত।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেইন রোয়ভারান জানিয়েছেন, হামলায় দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের উপদেষ্টা আলি শামখানিও রয়েছেন। তবে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠনের ঘোষণা এসেছে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ পরবর্তী নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে দায়িত্ব নেবেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত এই অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠন করা রাষ্ট্রের ‘সারভাইভাল প্রটোকল’ সক্রিয় হওয়ার প্রতীক। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্বাস আসলানি মনে করেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে, তবে সামনের দিনগুলোতে হামলা বাড়ার সম্ভাবনা আছে।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের রাজনৈতিক বয়ানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় বৈধতার বদলে এখন জাতীয়তাবাদ ও দেশরক্ষার বার্তা বেশি জোর পাচ্ছে। লারিজানি সতর্ক করেছেন, ‘ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানকে খণ্ডিত করা। এটি ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদেরও ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা।’

আরেকটি প্রশ্ন হলো—খামেনির সময়ের ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতি এখন কীসে রূপান্তর হবে? এ প্রেক্ষাপ তেহরান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান বলেন, ‘জুন ২০২৫-এর যুদ্ধ ইরানকে শিখিয়েছে, ধৈর্যকে দুর্বলতা মনে করা হয়। নতুন নেতৃত্ব হয়তো আক্রমণের জবাবে আরও শক্ত ও বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া দেখাবে।’

আল-জাজিরা সেন্টার ফর স্টাডিজের গবেষক লিকা মাকি বলেন, ‘এবারের হামলা ইরানের বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। পরবর্তী নেতৃত্ব এখানে এমন কাঠামো স্থাপন করতে পারে, যেখানে ভিন্নমতকে বিদেশি সহযোগিতা হিসেবে দেখা হবে।’

ফলে খামেনির মৃত্যু হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারসহ ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও অটুট। প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, এটি ভেঙে পড়বে, নাকি আরও শক্ত হয়ে পুনর্গঠিত হবে।


আল-জাজিরায় প্রকাশিত মোহাম্মদ মনসুরের লেখা বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন ‘উইল ইরানস এস্টাবলিশমেন্ট কলাপ্স আফটার দ্য কিলিং অব খামেনি’ অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।