ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান—কখন, কেন, কীভাবে

‘আজ রাতের মধ্যেই একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’-ট্রাম্পের এমন হুংকারের পর বিশ্বের সবখানেই শঙ্কায় ছিলেন সাধারণ মানুষ। যখন-তখন ফাঁকা হুমকি দেওয়া ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়, কিন্তু এই বক্তব্যে নড়েচড়ে বসেছিলেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বেঁধে দেওয়া সময় শেষে তাহলে কী হবে? একটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেবে, কেমন হতে পারে সেই আঘাত। তাহলে কি পারমাণবিক বোমা ছুড়বে যুক্তরাষ্ট্র? এই উৎকণ্ঠার মধ্যে ট্রাম্প জানালেন, শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য আক্রমণ বন্ধ রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। যে দুজন ব্যক্তির নাম তিনি উল্লেখ করেছেন এই সিদ্ধান্তে আসার প্রেক্ষিতে—সেটিই চমক। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
কিছুদিন আগেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিসরে বলতে গেলে পাত্তা না পাওয়া পাকিস্তান কীভাবে এত বড় ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারল, সেটি অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। তবে বিষয়টি হঠাৎ করে ঘটেনি, বরং পাকিস্তান বহুদিন ধরেই এ অবস্থানে বা ভূমিকায় যাওয়ার জন্য নেপথ্যে কাজ করে গেছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যম দ্য ডন একে পাকিস্তানের ‘বৃহত্তম
কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মাসাধিককালের যুদ্ধ এখন দুই সপ্তাহের বিরতিতে। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ধারাবাহিক, বিস্তর কূটনৈতিক আলোচনাই এই সাফল্যের রূপকার- দ্য ডনকে জানিয়েছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। পর্দার আড়ালের, প্রায় অপ্রকাশ্য এই বোঝাপড়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছাড়া কোনোকিছুই সম্ভব হতো না বলে মতামত রেখেছেন তারা।
পাকিস্তানই মূল মধ্যস্থতাকারী, নাকি নেপথ্যের আসল খেলোয়াড় চীন? প্রকাশ্য বক্তব্য আমলে নিলে এখানে অবশ্য পাকিস্তানই পুরো ক্রেডিট পেয়ে যাবে, কারণ ট্রাম্প সরাসরি পাক প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শালের নাম উল্লেখ করেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান কাজ শুরু করে দিয়েছিল। এমনিতে নিজেদের নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করলেও কূটনীতির মাঠে সব ধরনের চ্যানেলে জোরেশোরে যোগাযোগের কাজ শুরু করে দেশটি। এমনকি এ সময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি হলেও তেহরান ও ওয়াশিংটনের বিবদমান কূটনৈতিক ব্যবধানের মাঝখানে যোগসূত্র হয়ে উঠতে সক্ষম হয় পাকিস্তান।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের বেশ ‘কাছের’ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন, এমনকি হোয়াইট হাউসে তার সঙ্গে বসে লাঞ্চও করেছেন। ক্ষমতাধর এই সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাম্প ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে ডাকেন। আঞ্চলিক এবং সংস্কৃতিগতভাবে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ, আবার মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর মতো মধ্যস্ততা চাইলেও আক্রমণের ঝুঁকি থেকে বাইরে থাকা (যেহেতু পাকিস্তানে কোনো মার্কিন বিমানঘাঁটি নেই)—ইত্যাদি দৃশ্যমান কারণ পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যথাযথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটনের এই মধুর সম্পর্ক মোটেও বহুদিনের নয়, বরং সামান্য পেছনে গেলেই তাদের সম্পর্কের তিক্ত পরিস্থিতিই দেখা যায়। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন সেনারা পাকিস্তানে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক মন্দের দিকে গড়াতে থাকে। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কারারুদ্ধ করে রাখা, পাকিস্তান তালেবানদের সহায়তা করে দুই যুগ ধরে আফগান যুদ্ধ জিইয়ে রাখছে বলে ওয়াশিংটনের অভিযোগ—এসব দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ করে। তবে এখান থেকে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রাখে শাহবাজ শরিফের সরকার। মার্কিন সেনা হত্যায় অভিযুক্ত ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীকে আটক এবং হস্তান্তরে সহায়তা করে পাকিস্তান। এটি গত বছরের মার্চ মাসের ঘটনা। ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে বোমা হামলায় ১৭০ জন আফগান এবং ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন, আর তাতে ওই ব্যক্তি সন্দেহভাজন ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি মনে করেন, এই ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে বহুদিনের অবিশ্বাস দূর করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এরপর গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতময় পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়। এরপর শাহবাজ শরিফ এবং আসিম মুনির, দুজনেই ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার জন্য আহ্বান করেন।
পাকিস্তানের বর্তমান শাসনে সেনাসংশ্লিষ্ট ক্ষমতার প্রবল আধিপত্য রয়েছে। সে কারণে, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দেশটি শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এমনকি বেসামরিক কোনো নেতৃত্বর উপস্থিতি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আসিম মুনিরকে সরাসরি রিসিভ করেছেন। আলজাজিরার প্রতিবেদন বলছে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি এটি ট্রাম্পের একধরনের স্বীকৃতিরও বহিঃপ্রকাশ।
শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জায়িদি রয়টার্সকে বলেন, ‘কূটনৈতিক সম্পর্কের বিকাশে যদি কোনো একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হবে ফিল্ড মার্শাল এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস এবং সহাবস্থান।’
আসিম মুনির এবং শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে বিনিয়োগের সুযোগ, ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যবসার সঙ্গে ক্রিপ্টো চুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি এসেছে। এসবের মাধ্যমে ব্যবসায়িক চুক্তি ও ভূরাজনৈতিক জোটের সমন্বয়ে পাকিস্তানের নতুন কৌশলগত অবস্থান গড়ে তোলা হয়েছে। ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ মুনির এ বছর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে উপস্থিত একমাত্র কর্মরত সামরিক প্রধান ছিলেন। সেখানকার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আলজাজিরাকে জানায়, সেখানে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ আরও এগিয়ে নিয়েছেন এবং ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে কথা বলেছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবারও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ভ্যান্স ইরান সংঘাত নিয়ে যোগাযোগ করেন এবং স্পষ্ট করে দেন যে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে প্রস্তুত। অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পের পাশাপাশি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক করেছেন।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির অনুরোধের জন্য একটি পোস্ট করা হয়। সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রথমে পোস্টটি ড্রাফট বা ‘খসড়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও খানিক বাদেই ‘ড্রাফট’ বিষয়টি সরিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে পোস্টটি করা হয়। এরপর শাহবাজ শরিফ জানান, বিবদমান দুই দেশ বিরতিতে যেতে সম্মত হয়েছে এবং ১০ এপ্রিল উভয় দেশের প্রতিনিধিদের আলাপের মাধ্যমে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানও শাহবাজ শরিফ এবং আসিম মুনিরকে এই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। এই মধ্যস্থতায় অবশ্য চীনেরও ভূমিকা রয়েছে সেটি সামান্য উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তবে চীনের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রশমনে পাকিস্তান যে ভূমিকা নিয়েছে, সেখানে তাদের যেমন লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। আমদানি করা তেলের ওপর পাকিস্তান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এই আমদানি করা তেলের বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সুতরাং, হরমুজ যত বন্ধ থাকবে, পাকিস্তানও তত বেশি তেল সংকটে পড়তে থাকবে। সেখানে এরই মধ্যে কর্মদিবস সংক্ষিপ্ত করা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়গুলোর ঘটছে। এ ছাড়াও, পাকিস্তান এরই মধ্যে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রয়েছে আফগানিস্তানের সঙ্গে। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে এমন একটি যুদ্ধময় পরিস্থিতি, যেটি তাদের অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে—সেটির মধ্যস্থতা পাকিস্তানের জন্য বড় অর্জন হবে। পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ইরানের পক্ষপাতী, সুতরাং যুদ্ধবিরতিতে দেশটির এই ভূমিকা সরকারের প্রতিও জনগণের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে।
বৈশ্বিক কূটনীতিতে এই ঘটনা পাকিস্তানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে এরই মধ্যে। সামনে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার ফলাফল কোন দিকে গড়াবে, তার ওপর পাকিস্তানেরও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে নিজেদের ভবিষ্যত অবস্থান তৈরি হবে। এখানে আলোচনা যদি পুরোপুরি সফল নাও হয়, তার পরেও তাদের প্রচেষ্টা যে স্বীকৃতি পেয়েছে তা ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই নিশ্চিত করেছে। ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক এই ঘটনার মাধ্যমে আরও এগিয়ে নিতে পেরেছে পাকিস্তান সরকার। ইসলামাবাদের কাছে এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা এরই মধ্যে একটি বড় বিজয়, যেটি সামনে আরও কোন পর্যায়ে যাবে তা ১০ এপ্রিলের বৈঠকের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সূত্রসমূহ : বিবিসি, আলজাজিরা, দ্য ডন, রয়টার্স, ইকোনমিক টাইমস