logo

বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানির দাম কেমন?

বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানির দাম কেমন?
অপরিশোধিত তেল উৎপাদন কেন্দ্র। ছবি: সাটারস্টক

আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সোমবার থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন—সবগুলোর দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

নতুন দামে বাংলাদেশে ডিজেল ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটার। অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। সরকারের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম মার্চের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং একই সময়ে পরিবহন বা ফ্রেইট খরচও বেড়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোতে একই সময়ে জ্বালানির দাম কত? বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে পার্থক্যটাই বা কেমন?

রয়টার্স ও এডিটিভির প্রতিবেদন এবং ‘নেপালি পেট্রল ডটকম’ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী একনজরে দাম প্রতিবেশী দেশগুলোয় জ্বালানির দাম নিম্নরূপ।

২১ সেপ্টেম্বরের স্থানীয় বাজারদর ও ওই সময়ের বিনিময় হার ধরে আনুমানিক বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে চিত্রটি এমন:

 দেশ ও বাজার পেট্রোল/লিটারবাংলাদেশি টাকায় ডিজেল/লিটারবাংলাদেশি টাকায়
 বাংলাদেশ  ৳১৬০   ১৬০ টাকা   ১৩৫ টাকা  ১৩৫ টাকা
 ভারত (দিল্লি) ₹১০২.১২  প্রায় ১৩১ টাকা   ₹৯৫.২০  প্রায় ১২২ টাকা
 ভারত (কলকাতা) ₹১১৩.৪৭ প্রায় ১৪৫ টাকা ₹৯৯.৮২ প্রায় ১২৮ টাকা
 পাকিস্তান PKR ৩৮৯.১৪ প্রায় ১৭২ টাকা PKR ৪২৪.০৪ প্রায় ১৮৮ টাকা
 নেপাল (কাঠমান্ডু) NRs ২০০  প্রায় ১৬১ টাকা NRs ২০০ প্রায় ১৬১ টাকা

ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে পেট্রোল সস্তা, ডিজেলও কিছুটা কম

ভারতে জ্বালানির দাম শহর ও রাজ্যভেদে পরিবর্তিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে পেট্রোলের দাম ছিল ১০২.১২ রুপি এবং ডিজেল ৯৫.২০ রুপি লিটার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় আনুমানিক ১৩১ ও ১২২ টাকা।

অর্থাৎ দিল্লির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে পেট্রোল প্রায় ২৯ টাকা এবং ডিজেল প্রায় ১৩ টাকা বেশি।

তবে ভারতের ক্ষেত্রে এই তুলনাকে পুরো দেশের চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। রাজ্যভেদে ভ্যাট ও অন্যান্য করের কারণে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। যেমন ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতায় পেট্রোল ছিল ১১৩.৪৭ রুপি এবং ডিজেল ৯৯.৮২ রুপি লিটার।

পাকিস্তানে দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি

পাকিস্তানে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে পেট্রোলের দাম কমিয়ে ৩৮৯.১৪ পাকিস্তানি রুপি এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৪২৪.০৪ রুপি করা হয়। এই দাম ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে পাকিস্তানে এক লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ১৭২ টাকা এবং ডিজেল প্রায় ১৮৮ টাকা।

অর্থাৎ এই তুলনায় পাকিস্তানের পেট্রোল বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১২ টাকা এবং ডিজেল প্রায় ৫৩ টাকা বেশি।

পাকিস্তানে জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, কর ও অন্যান্য উপাদানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জ্বালানি বাজারেও আন্তর্জাতিক তেলের দামের বড় ওঠানামার প্রভাব পড়েছে।

নেপালে পেট্রোল বাংলাদেশের কাছাকাছি

নেপালেও ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। নেপাল অয়েল করপোরেশনের নতুন দামে কাঠমান্ডু উপত্যকায় পেট্রোল ২০০ নেপালি রুপি এবং ডিজেলও ২০০ রুপি লিটার হয়েছে।

বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে পেট্রোলের দাম প্রায় ১৬১ টাকা এবং ডিজেল প্রায় ১৬১ টাকা।

তবে নেপালের দামও দেশের সব অঞ্চলে একই নয়; অঞ্চলভেদে পরিবহন ব্যয়ের কারণে পার্থক্য থাকতে পারে।

তাহলে কোথায় কত বেশি?

পেট্রোলের ক্ষেত্রে এই চার বাজারের তুলনায়

• বাংলাদেশ: ১৬০ টাকা

• পাকিস্তান: প্রায় ১৭২ টাকা

• ভারত(দিল্লি): প্রায় ১৩১ টাকা

• নেপাল(কাঠমান্ডু): প্রায় ১৬১ টাকা

আর ডিজেলের ক্ষেত্রে—

• বাংলাদেশ: ১৩৫ টাকা

• পাকিস্তান: প্রায় ১৮৮ টাকা

• ভারত(দিল্লি): প্রায় ১২২ টাকা

• নেপাল(কাঠমান্ডু): প্রায় ১৬১ টাকা

একই আন্তর্জাতিক বাজার, কিন্তু দেশে দেশে জ্বালানির দাম ভিন্ন কেন?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়া বা কমা সব দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক ব্যারেল তেলের দাম যতই হোক, সেই তেল ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর প্রতিটি দেশে একই দামে বিক্রি হয় না। কারণ পাম্পের দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের মূল্যের পাশাপাশি আরও কয়েকটি খরচ যুক্ত হয়।

প্রথমত, কর ও শুল্ক। প্রতিটি দেশের সরকার জ্বালানির ওপর ভিন্ন হারে কর, শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ করে। ফলে একই দামে আমদানি করা তেল হলেও করের পার্থক্যের কারণে পাম্পের দাম আলাদা হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মুদ্রার বিনিময় হার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সাধারণত মার্কিন ডলারে কেনা হয়। কোনো দেশের মুদ্রার মূল্য ডলারের বিপরীতে কমে গেলে একই পরিমাণ তেল আমদানি করতে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

তৃতীয়ত, পরিবহন ও আমদানি ব্যয়। তেল কোথা থেকে আসছে, কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, জাহাজভাড়া, বিমা, বন্দর খরচ এবং দেশের ভেতরে পরিবহনের খরচ—সবই চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলে।

চতুর্থত, সরকারের মূল্য নির্ধারণের নীতি। কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে দ্রুত জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে পারে। আবার কোনো দেশ ভোক্তার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে কিছু সময় বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ সরকার বা রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির মাধ্যমে বহন করতে পারে।

পঞ্চমত, স্থানীয় বাজারের কাঠামো। জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা, পরিশোধন ও আমদানির সক্ষমতা এবং দেশের ভেতরের বিতরণব্যবস্থার খরচও একেক দেশে একেক রকম।

তাই একই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কিনলেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের পাম্পে দাম এক হবে—এমন নয়। আন্তর্জাতিক তেলের দাম হলো চূড়ান্ত মূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; এর সঙ্গে কর, বিনিময় হার, আমদানি-পরিবহন ব্যয় এবং সরকারি মূল্যনীতির মতো বিষয় যোগ হয়ে একজন ভোক্তার দেওয়া চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়।