পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এবার মাছ নিয়ে এত হইচই কেন

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের লড়াই এবার রাজনীতির ময়দান থেকে পৌঁছে গেছে রান্নাঘর পর্যন্ত। আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের মন জয় করতে মোদি-মমতা উভয়পক্ষই এখন ‘মাছ’ নিয়ে মাতোয়ারা। সম্প্রতি বিজেপির এক প্রার্থীকে হাতে কাতলা মাছ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ভোট চাইতে দেখা গেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বিরল দৃশ্য।
কিন্তু মাছ নিয়ে কেন?
বাঙালি সংস্কৃতিতে মাছ কেবল খাদ্যমাত্র নয়, এটি আবেগেরও অংশ। সেই আবেগকে পুঁজি করেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছে। মমতার দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ, মাংস এমনকি ডিম খাওয়াও বন্ধ করে দেবে।
এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে বিজেপি। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে বিজেপির অবস্থান ঘিরে জনমনে থাকা সংশয় দূর করতে তারা এখন মাছ নিয়ে নামছে নির্বাচনি প্রচারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ এবং বাঙালি সংস্কৃতিবিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে বিজেপি নিজেদের ‘আমিষবিরোধী’ ভাবমূর্তি কাটাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরকে দিয়ে ক্যামেরার সামনে মাছ খাইয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।
এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন, অবকাঠামো বা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এবার পশ্চিমবঙ্গের ভোটে পাবদা, ইলিশ, কাতলার মতো মাছগুলো ভোটারদের রায় নির্ধারণে বড় প্রভাবক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উৎস রায়ের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাছ বাঙালির ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার মাছ খান। এই বিশাল অংশের ভোটারকে প্রভাবিত করতেই মাছ এখন প্রচারের প্রধান অনুষঙ্গ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মতে, ‘মাছের এই ইস্যুটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সুনিপুণ রাজনৈতিক চাল। বিজেপি এই বিতর্কে জড়িয়ে মূলত মমতার তৈরি করা ফাঁদেই পা দিয়েছে।’
অন্যদিকে, সমাজকর্মী বনজ্যোৎস্না লাহিড়ির মতে, ‘বিজেপি এখন বুঝতে পেরেছে, নিরামিষাশী ভাবমূর্তি নিয়ে বাঙালির মন জয় করা কঠিন। তাই মাছ নিয়ে প্রচার করা তাদের জন্য একটি গিমিক বা কৌশল মাত্র।’
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ভোটার ভোট দেবেন। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই ভোটের ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ মে।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ লাখ মানুষ তাদের নাম বাতিলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
লেখক: সাংবাদিক।