হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা মোকাবিলায় ট্রাম্পের ডাক, শুনছে না কেউ

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির বিশ্ব জ্বালানি বাজার। এই পরিস্থিতিতে রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই আহ্বানে এখন পর্যন্ত প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বরং এরমধ্যেই কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের আহ্বান নাকচ করে দিয়েছে।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ব্রিটেন যেন দ্রুত ওই এলাকায় জাহাজ পাঠায়। ইরান বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে, তাই হরমুজ প্রণালি আর হুমকির কারণ হওয়া উচিত নয়।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এ আহ্বান সত্ত্বেও তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনায় অধিকাংশ রাষ্ট্রই ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে সরাসরি সাড়া না দিয়ে এক ধরনের নীরবতা পালন করছে।
এদিকে তিনি ন্যাটো মিত্রদের সতর্ক করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যদি তারা এই সংকটে এগিয়ে না আসে, তবে সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘অন্ধকার’ বা ‘খুবই খারাপ’ হতে পারে।
এছাড়া ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো কয়েকটি দেশ সরাসরি ট্রাম্পের আহ্বান নাকচ তরে দিয়েছে। চলমান অস্থিরতার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তারা জাহাজ পাঠাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট রোববার (১৫ মার্চ) এনবিসি নিউজকে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের উল্লেখ করা কিছু দেশের সঙ্গে আলাপ করছেন। কিন্তু দেশগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এসময় তিনি হরমুজ প্রণালির পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে চীনের গঠনমূলক অংশীদারত্ব আশা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে চীনের দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ জানান, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা সব পক্ষের দায়িত্ব। উত্তেজনা প্রশমনে চীন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কার্যকরভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরোধ করে রেখেছে। তাদের লক্ষ্য বিশ্ব তেল বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ছাড়া সবার জন্য উন্মুক্ত।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘছি সিবিএসকে বলেন, বেশ কিছু দেশ তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সামরিক বাহিনীর।
এদিকে ভারতের পতাকবাহী দুটি গ্যাস ট্যাংকার কোনো বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার ফলে শনিবার (১৪ মার্চ) ভারতের পতাকাবাহী গ্যাস ট্যাংকার দুটি এই প্রণালি অতিক্রম করেছে।
সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে
ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও), ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) এবং ইরাক ও ইরানের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে।
আলজাজিরার খবর অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, সব লক্ষণ এই যুদ্ধের তুলনামূলক দ্রুত সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে এবং হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না।
স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন আলজাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার জন্য চীন নৌবাহিনী পাঠাবে কি না এ বিষয়ে তিনি সন্দিহান। এর প্রয়োজনও নেই, কারণ ইরানের তেল বেশ ভালোভাবেই চীনে যাচ্ছে। ইরান কেবল সেইসব দেশের তেল সরবরাহ বন্ধ করছে যারা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বৈশ্বিক নৌ-পরিবহনে ব্যাঘাত বন্ধ করতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার গুরুত্ব নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বলেছেন।
সাহস থাকলে উপসাগরে ট্রাম্পকে জাহাজ পাঠাতে বলল ইরান
ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে- ট্রাম্পের এই দাবির চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে নাইনি বলেন, ট্রাম্প কি বলেননি, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে? যদি তাই হয়, তবে সাহস থাকলে তাকে তার জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে পাঠাতে দিন।