মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে এবার হুতি, কোন পথে বিশ্ব অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মাথায় ইরানের পক্ষে লড়াইয়ে অংশ নিল ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা। ইরান-সমর্থিত এই প্রক্সি বাহিনী ইতোমধ্যে ইসরায়েল লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর মাধ্যমে চতুর্থ বৃহত্তম নৌপথ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার হুমকিও দিয়েছে। এই জলপথ দিয়ে দৈনিক প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বাণিজ্য হয়ে থাকে, যা বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।
এমতাবস্থায় যুদ্ধে হুতিদের অংশগ্রহণের ফলে প্রশ্নটি উঠেছে, তেহরান-সমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি লোহিত সাগর করিডোর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আবারও লক্ষ্যবস্তু করবে কি না। ইরানের কৌশলগত হরমুজ প্রণালির সঙ্গে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল বন্ধ হলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বিশ্ব, এ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে হুতি গোষ্ঠীর সরাসরি জড়িয়ে পড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও নৌপরিবহনকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় এক মাস ধরে কার্যত অচল। এখন নজর পড়েছে আরেক কৌশলগত রুট বাব আল-মান্দেবের দিকে, যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। ‘অশ্রুর দ্বার’ নামে পরিচিত এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া, ফলে সামান্য বিঘ্নও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থা ইউএস এনার্জি ইনফোরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রথম ১১ মাসে এই পথ দিয়ে ৩০ মিলিয়ন টনের বেশি তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), বিপুল কনটেইনার পণ্য এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত বৈশ্বিক তেলের প্রায় ১২ শতাংশ চলাচল করেছে।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সামরিক অভিযান শুরু হলে হুতিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। গত নভেম্বরে সাময়িক বিরতি দেওয়ার আগে তারা ১০০টিরও বেশি জাহাজে আঘাত হানে।
এর ফলে বহু জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়েছে, যা যাত্রার সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি হুতি প্রশাসনের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনসুর সিএনএনকে বলেছেন, বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করা তাদের জন্য ‘কার্যকর বিকল্প’ হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানও কড়া বার্তা দিয়েছে। দেশটির একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করে, তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এই অবস্থায় তেল রপ্তানির পথ বদলাতে শুরু করেছে সৌদি আরব। দেশটি পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে। ফলে লোহিত সাগরে ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ইকোনমিকটাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ইতোমধ্যে মার্স্ক, হ্যাপাগ-লয়েড ও সিএমএ সিজিএমের মতো প্রধান জাহাজ সংস্থাগুলো লোহিত সাগর করিডোরের রুট স্থগিত করেছে। জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে অন্য পথে পাঠাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে জাহাজ চলাচলের সময় ও খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত ‘দ্বৈত প্রতিবন্ধকতা’ সংকটে রূপ নিচ্ছে। অর্থাৎ যদি একসঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বকে কয়েক দশকের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি প্রধান সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং শিপিং খাতের ওপর চাপ দ্রুত বাড়ছে; যার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই সামুদ্রিক পথের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ইতোমধ্যেই অনেক দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।