logo

অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বেশি পশ্চিমবঙ্গে

অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বেশি পশ্চিমবঙ্গে

লোকসভা, বিধানসভা, পৌরসভা কিংবা পঞ্চায়েত। নির্বাচন আর নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত পশ্চিমবঙ্গে এখন সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যটিতে বর্তমানে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। আর সে সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতের ছবিও উঠে আসছে রাজ্যটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এমন সময় নির্বাচনি সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, গত ছয় বছরে ভারতের অন্য যে কোনো রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বেশি ঘটেছে।

গত ১৫ মার্চ ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এর ঠিক তিন দিন পর উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাড়োয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের এক বুথ সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। যদিও ওই ঘটনা কোনো ব্যতিক্রমী নয়। শনিবার রাত পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর আসে।

বাংলার নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ইতিহাসের শুরুটা ১৯৫০-এর শতকে, যা এখনও বিদ্যমান। ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন, ক্ষমতাসীন দল সবসময়ই নির্মমভাবে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালানোর প্রচেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতা দীর্ঘকাল ধরেই বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। ওই বছর ৩০০টি সহিংসতার ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এর পরেই ছিল অন্ধ্রপ্রদেশ, যেখানে ২০২৪ সালের বিধানসভার নির্বাচন ঘিরে ৮৯টি সহিংসতার ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়।

এসিএলইডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত লোকসভা, বিধানসভা এবং স্থানীয় নির্বাচন (পুরসভা, পঞ্চায়েত) মিলিয়ে ভারতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনার শতকরা ৩৫ শতাংশই সংঘটিত হয় পশ্চিমবঙ্গে এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক মোট প্রাণহানির ৫১ শতাংশ ঘটেছে শুধু পশ্চিমবঙ্গে।

তথ্য বলছে, বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিটি আসনে গড়ে ১ দশমিক শূন্য ২টি, উত্তর প্রদেশে ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিটি আসনে গড়ে শূন্য দশমিক ১২টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।

এছাড়াও বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাডু ও রাজস্থানে তাদের সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে প্রতি জায়গাতেই কমবেশি ৪০টির মতো ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ছোট রাজ্যগুলোর মধ্যে ত্রিপুরায় ২০২৩ সালের নির্বাচনে ৭০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, ২০২২ সালে মণিপুরের নির্বাচনে ৫৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। 

ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচন ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত আটটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ পর্ব দীর্ঘ হওয়ার কারণে সহিংসতাও বেড়ে গিয়েছিল। ওই বছরের এপ্রিল ছিল সবচেয়ে ‘সহিংস মাস’। মাসটিতে ১২৩টি সহিংসতার ঘটনা এবং ১৯ জনের মৃত্যু হয়। ওই বছরের ২ মে ভোটের ফলাফল ঘোষণা ও তার পরে ৮৮টি সংঘর্ষের ঘটনা এবং ৩১ জনের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। কার্যত মে মাসের সহিংসতার বেশিরভাগই ছিল প্রতিশোধমূলক।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন আটটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার কারণে সহিংসতার ঘটনাও বৃদ্ধি পায়।

এবারের নির্বাচন হবে দুইটি ধাপে। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল, ১৫২টি আসনে এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ। ভোট গণনা হবে ৪ মে।

ফলে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হতে মাঝে এখনো প্রায় দিন দশেক বাকি। যদিও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অশান্তি, সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে। প্রচারণা চলাকালীন একে অপরকে উদ্দেশ্য করে পাল্টাপাল্টি স্লোগান, কখনো দেয়াল লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কখনো প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব; সবমিলিয়ে ঘটনার ঘনঘটা।

এমনকি শনিবার সন্ধ্যায়ই প্রচারণার সময় ব্যারাকপুর আসনের বিজেপি প্রার্থী কৌস্তব বাগচীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে একসময় টিটাগড়ে বিটি রোড অবরোধ করে বিজেপির কর্মী সমর্থকরা। ভাঙড়ের চড়িশ্বরে আইএফএসের বিদায়ী বিধায়ক তথা এবারের প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকীর কনভয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। শনিবার রাতের ওই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। গাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হয়। নওসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়িবহরের পিছনের কাঁচ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ নওসাদের।

অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ভোট সহিংসতা নিয়ে ভিন্ন অভিমত দিয়েছেন প্রার্থীরা। রাজ্যটির নোয়াপাড়া আসনের সিপিআইএম প্রার্থী গার্গী চ্যাটার্জী বলেন, 'আমরা মনে করি এই সহিংসতা বন্ধ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হওয়া উচিত।'

নোয়াপাড়ার বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিং বলেন, 'আমরা বারবার এই কথাই বলি। বামপন্থীরা সহিংসতা শুরু করেছিল, এখন মমতা ব্যানার্জি সেই হিংসার উপর ভর করে সরকারে আছেন।'

যদিও বিরোধীদের দাবিকে খারিজ করে খড়দহ আসনের টাউন তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি সুকন্ঠ বণিক বলেন, 'পশ্চিমবঙ্গের মতো এত শান্তিপূর্ণ জায়গা ভারতের আর কোথাও নেই। একটা সময় আমরা ক্যাম্প অফিস করতে পারতাম না। এখন বিরোধীরা সসম্মানে এখানে এসে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারছেন। এর থেকে বড় গণতন্ত্র কোথায় আছে?'

পশ্চিমবঙ্গে এই সহিংসতা ও অশান্ত পরিবেশ তৈরির পিছনে তৃণমূলকেই দায়ী করে বিজেপি। দুদিন আগেই হলদিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই অভিযোগ করেন, 'তৃণমূলের রাজনীতির একটাই উদ্দেশ্য, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। সেই করণে পশ্চিমবঙ্গে অপরাধীদের দোকান ফুলেফেঁপে উঠেছে।’

আবার শনিবার বর্ধমানের পূর্বস্থলী থেকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি আরও চার রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে। ইতোমধ্যে আসাম, কেরালা এবং পুদুচেরিতে ভোট গ্রহণ হয়ে গেছে। কিন্তু একটাও সহিংসতার ঘটনা ছাড়াই ভোট শান্তিপূর্ণভাবে মিটেছে।’

পাল্টা অভিযোগ পশ্চিমঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। তিনি বলেন, ‘বিজেপির কারণে গোটা দেশের সর্বনাশ হয়েছে। এমনকি আসামেও নির্বাচনের দিন উত্তর প্রদেশ থেকে ট্রেনে করে ৫০ হাজার লোক এনেছে।’