ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে যাচ্ছে সৌদি ও আমিরাত

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দর-কষাকষি চলছে। আলোচনায় ১৫টি শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বিপরীতে পাঁচ শর্ত দিয়েছে ইরান। শান্তি আলোচনার মধ্যে এবার খবর এলো অশান্তির। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দুই মিত্র দেশ সৗদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্রমাগত হামলার ফলে নিজস্ব অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ দুটির। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যের ঝুঁকির মুখে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার দিকে ঝুঁকছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তেহরানের অর্থশক্তির ওপর আঘাত হানা এবং আমেরিকার বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে। তবে তারা এখনও সরাসরি যুদ্ধে নিজেদের সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার মতো পর্যায়ে যায়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলো আগে জানিয়েছিল, তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সীমারেখা অতিক্রম করতে চায় না। কিন্তু জ্বালানি সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে তেহরান যেভাবে প্রভাব বিস্তারের হুমকি দিচ্ছে, তাতে তাদের ওপর চাপ বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধে আরব উপদ্বীপের পশ্চিম দিকে অবস্থিত সৌদি আরবের কিং ফাহদ বিমান ঘাঁটি মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্মত হয়। এর আগে রিয়াদ জানিয়েছিল, তারা ইরানের ওপর হামলার জন্য তাদের স্থাপনা বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু রাজধানী রিয়াদ এবং সৌদি জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সেই অবস্থান এখন বদলে যাওয়ার সম্ভানা দেখা দিয়েছে।
গত সপ্তাহে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি হামলার মুখে সৌদি আরবের ধৈর্য অসীম নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো জবাব দিতে অক্ষম—এমন কোনো ধারণা করা ভুল হবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আগ্রহী এবং যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি রয়েছেন।
সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের যুদ্ধে প্রবেশ করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
অন্যদিকে যুদ্ধ এক মাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানি মালিকানাধীন সম্পদগুলোর ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই পদক্ষেপ তেহরানের শাসকদের জীবনরেখাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আরব আমিরাত এখন যুদ্ধে তাদের সামরিক বাহিনী পাঠাবে কি না তা নিয়েও ভাবছে। এমনকি তেহরান সামরিক সক্ষমতাকে অক্ষত রাখে এমন যুদ্ধবিরতির বিরুদ্ধে লবিং করছে আরব আমিরাত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, আরব আমিরাত সম্প্রতি দুবাইতে অবস্থিত ইরানি হাসপাতাল এবং ইরানি ক্লাব বন্ধ করে দিয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) হাসপাতালের ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল এবং ওয়েবসাইট অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানি শাসন ব্যবস্থা এবং ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। কারণ, এগুলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অপব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি জনগণের উপকারে আসেনি কখনও এবং আমিরাতের আইনের পরিপন্থি।
আরব আমিরাতের দীর্ঘদিন ধরে ইরানি ব্যবসার আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে তারা তেহরানকে সতর্ক করেছে, যুদ্ধের শুরুতে বড় ধরনের হামলার শিকার হওয়ার পর তারা এখন ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করতে পারে। এই পদক্ষেপ ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেবে, যা মুদ্রাস্ফীতি ও নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত দেশটির অর্থনীতিকে ধসের মুখে ফেলতে পারে।
সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সাম্প্রতিক হামলা করায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কাতার এই হামলাগুলোকে বিপজ্জনক উস্কানি এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান যদি অবিলম্বে হামলা বন্ধ না করে, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক বাহিনী সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধ এক মাসে গড়ানোর আগেই এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে।