যুদ্ধ আর বাস্তুচ্যুতির ছায়ায় ফিকে মধ্যপ্রাচ্যের ঈদ

আকাশজুড়ে বারুদের গন্ধ আর জমিনে স্বজন হারানোর শোকে হাহাকার। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা দিলেও উৎসবের ছিটেফোঁটা নেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে। বৈরুত থেকে তেহরান কিংবা গাজা—সবখানেই আজ ঈদের আনন্দকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের অভিজাত ওয়াটারফ্রন্ট এলাকাটি দামি রেস্তোরাঁর জন্য পরিচিত। কিন্তু আজ সেখানে সারি সারি তাঁবু। সিরীয় শরণার্থী আলাউ, যিনি গোলান মালভূমি থেকে এসে বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন তিনি। সারাদিন একটি আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে ক্লান্ত আলাউ।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘একটি স্কুলে জায়গা চেয়েছিলাম, পাইনি। এখন খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটছে। ঈদ নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? আমার এখন একটা তাঁবু দরকার।’
আলাউ আগে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী দাহিয়েহ-তে থাকতেন। ইসরায়েলি হামলায় এলাকাটি এখন বিধ্বস্ত। লেবাননজুড়ে এই হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখন আলাউ কেবল একটু নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার (২০ মার্চ) থেকে শুরু হওয়া মুসলিম উৎসব ঈদুল ফিতর তার চিন্তার ধারেকাছেও নেই। লেবাননজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন আলাউয়ের মতো বাস্তুচ্যুত।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার আজ তৃতীয় সপ্তাহ। তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজার বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে কেনাকাটা করা এখন প্রাণঝুঁকির শামিল। যুদ্ধের আগের চরম অর্থনৈতিক মন্দা উৎসবের বাজারকে আগেই পঙ্গু করে দিয়েছিল, এখন তার সাথে যোগ হয়েছে বোমার আতঙ্ক।
ঈদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে আলাউ না সূচক উত্তর দেন। তার বদলে তার পুরো মনোযোগ এখন একটি তাঁবু জোগাড়ের দিকে।
অন্যদিকে, ইরানে ঈদের ধর্মীয় আবহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ। দেশটির সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলো যে কোনো ধর্মীয় আচারকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখছে। কাকতালীয়ভাবে এ বছর শুক্রবার পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’ এবং ঈদ একই দিনে হওয়ায় বিক্ষোভকারীরা ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে কেবল নওরোজ পালনের দিকে ঝুঁকছেন।
এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা নিয়ে লেবাননের মানুষ অনিশ্চিত। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চলা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ধকল তারা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমান এই পরিস্থিতির কারণে উৎসব করা কঠিন হয়ে পড়েছে—যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অন্য দেশগুলোরও সাধারণ চিত্র।
গাজায় কোনোরকম টিকে থাকার সংগ্রাম
আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু গাজা ভূখণ্ডের রিমাল বাজারে আজ উৎসবের রঙের চেয়ে অভাবের ধূসরতাই বেশি স্পষ্ট। দীর্ঘ দুই বছরের ইসরায়েলি আগ্রাসন আর ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধের জেরে গাজার অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বাজারের ভিড় দেখে বাইরে থেকে ঈদের আমেজ মনে হলেও, ভেতরে লুকানো রয়েছে এক চরম দীর্ঘশ্বাস।
গাজার অনেক ফিলিস্তিনিই ঈদ উদযাপন করতে চান, কিন্তু ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট তা কঠিন করে তুলেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় পণ্য প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ আরও বেড়েছে, যা শিশুদের খেলনাসহ সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
গাজা সিটির আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে বসবাসকারী ৬২ বছর বয়সি খালেদ দিব ঈদের আগে ফল ও সবজির দাম কেমন বেড়েছে তা দেখতে সেন্ট্রাল রিমাল বাজারে গিয়েছিলেন। ভিড় জমানো বাজারের দিকে ইঙ্গিত করে খালেদ বলেন, ‘বাইরে থেকে ঈদের পরিবেশ প্রাণবন্ত মনে হতে পারে, কিন্তু আর্থিকভাবে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন তাঁবু ও আশ্রয়ে বসবাস করছে। যুদ্ধের সময় সবাই সবকিছু হারিয়েছে।’
খালেদ জানান, তিনি ফল ও সবজি কেনার সামর্থ্য রাখেন না। এগুলো এখন কেবল ‘রাজারা’ কিনতে পারেন। তার মতো ‘দরিদ্র ও ক্লান্ত’ মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব। যুদ্ধের আগের দিনগুলোর স্মৃতি পরিস্থিতিকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। অথচ তার নিজের একটি সুপারমার্কেট ছিল।
খালেদ বলেন, ‘ঈদের সময় আমি আমার মেয়ে ও বোনদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তিন হাজার শেকেলেরও (ফিলিস্তিনি মুদ্রা) বেশি উপহার দিতাম। ঘর গোছানো, বাচ্চাদের ঈদের পোশাক, মিষ্টি ও চকোলেট—সবই থাকত।’ এবার গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও তার কোনোটিই ঘটছে না।
তিন সন্তানের মা শিরিন শ্রীমও একই আক্ষেপ প্রকাশ করেন। বাজারে ঘোরার সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের ঈদের আনন্দ অপূর্ণ। আমরা দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধ ও কষ্ট পেরিয়ে এমন এক জীবনে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে মৌলিক প্রয়োজনগুলোও মিলছে না।’ ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনি ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে গাজা কবে পুনর্গঠিত হবে তা নিয়ে শিরিন সন্দিহান।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকি যার দেয়ালগুলো পুরোপুরি ফাঁপা। আমি আর আমার স্বামী ত্রিপল আর কাঠ দিয়ে কোনোমতে থাকছি। তাও অন্যদের চেয়ে আমরা ভালো আছি। কিন্তু যখনই বাড়ি ফিরি, খুব কষ্ট হয়। মানুষ রাস্তায় প্লাস্টিক আর কাপড়ের তাঁবুতে মানবেতর বাস করছে। এই মানুষগুলো কীভাবে ঈদ উদযাপন করবে?’
এদিকে বৈরুতে রাজনৈতিক গবেষক ও সংগঠক করিম সাফিয়েদিন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করছেন। তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত, তবুও আমরা বিশ্বাস করি এই পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং সাম্প্রদায়িক সংহতি তৈরি করাই এই যুদ্ধে টিকে থাকার প্রথম শর্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংহতি ছাড়া আমরা সমাজ বা দেশ গড়তে পারব না। বোমার নিচে বাস করে কোনো কৃত্রিম ইতিবাচকতা ছাড়াই একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখার এটাই শুরুর বিন্দু।’
উপসাগরীয় দেশগুলোতে খোলামাঠে ঈদের জামাতে নিষেধাজ্ঞা
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বছর উপসাগরীয় দেশগুলোতে খোলামাঠে ঈদের জামাত আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ শুধু মসজিদের ভেতর পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এরই মধ্যে মুসল্লিদের জানিয়েছে, পবিত্র রমজান মাস শেষে ঈদের নামাজের জন্য ঐতিহ্যবাহী খোলা ময়দানগুলোতে যেন তারা ভিড় না করেন। সাধারণত এসব ময়দানে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন।
চলমান সংঘাত ও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় জনসমাগমের নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন করে এ সিদ্ধান্তকে ‘সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
সূত্র: আলজাজিরা, ডন