ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অষ্টম দিনে যা যা হলো

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরুর এক সপ্তাহ পর মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিস্তৃত হয়েছে সংঘাত। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
শনিবার (৭ মার্চ) ভোরে তেহরানে নতুন করে তীব্র বোমা হামলার পর হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার থেকে যুদ্ধের অষ্টম দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত ইরানে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড। এতে ইরানের ৪৩টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে, নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, আত্মসমর্পণ ছাড়া কোনো সমঝোতা হবে না।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আপাতত খোলা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো জাহাজ সেখানে দিয়ে গেলে তা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তারা ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য দিচ্ছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি
কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই তিন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। কাতার জানিয়েছে, শুক্রবার তাদের দিকে ছোড়া ১০টি ইরানি ড্রোনের মধ্যে ৯টি ভূপাতিত করা হয়েছে।
রাজধানী রিয়াদের কাছে কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তেলের মজুত রাখার জায়গা সংকট দেখা দেওয়ায় কিছু তেলকূপে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে দেশটি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রয়োজনে সৌদি আরবকে রক্ষায় যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
আঞ্চলিক আকাশপথ আংশিকভাবে খুলতে শুরু করেছে। দোহায় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জরুরি রুট ব্যবহার করে কিছু ফ্লাইট চালু করেছে। কাতার এয়ারওয়েজ লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ, রোম ও ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশেষ ফ্লাইট চালানোর ঘোষণা দিয়েছে।
ইসরায়েলের পরিস্থিতি
ইরান নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যাচ্ছে। তেল আবিব, উত্তর ইসরায়েল এবং নেগেভ মরুভূমির কাছে বিয়ারশেবা এলাকায় বিস্ফোরণ ও সাইরেন বাজানোর খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইরান ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মধ্যে রাখতে চাইছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে চাইছে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনো সীমা মানছে না এবং তারা যুদ্ধাপরাধ করছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় রকেট হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের পরিস্থিতি
হোয়াইট হাউস বলেছে, এই সামরিক অভিযান চার থেকে ছয় সপ্তাহ চলতে পারে। তবে পেন্টাগন নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অস্ত্র উৎপাদন চার গুণ বাড়ানোর কথা বলেছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযানের প্রথম ১০০ ঘণ্টায়ই প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার আক্রমণ ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একটি বি–১ বোমারু বিমান যুক্তরাজ্যের একটি ঘাঁটিতে পৌঁছেছে।
লেবানন ও ইরাক
পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের।
দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২১৭ জন নিহত হয়েছেন।
তীর শহর ও বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকা থেকে বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। বৈরুতের অনেক স্কুল এখন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন হামলা বন্ধে মিত্র দেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমর্থন জানিয়েছেন।
ইরবিলের একটি হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছিল, ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো বিদেশিদের ব্যবহৃত হোটেল লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর সার্বিক চিত্র
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবাননে নিহত হয়েছেন ২০০ জনের বেশি। ইসরায়েলে নিহত ১১ জন এবং মারা গেছেন ছয় মার্কিন সেনা।
২ মার্চ হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এদিকে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোর দিকে ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ।
আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘ইরান ওয়ার: হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং অন ডে এইট অফ ইউএস-ইসরায়েল অ্যাটাকস’ শীর্ষক এক্সপ্লেইনার প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।