হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে খাদ্যপণ্যের দাম

ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে হামলা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ফলে অনেক জাহাজের মালিক ঝুঁকি না নিয়ে হরমুজ প্রণালির প্রান্তে জাহাজ নোঙর করে যুদ্ধ থামার অপেক্ষা করছে। ফলে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ কমে গেলে এবং চাহিদা বাড়তে থাকলে দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। যার প্রভাব পড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিট্যাড) সতর্ক করে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে এবং বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হতে পারে।’
নতুন এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের ৩৮ শতাংশ, এলপিজির ২৯ শতাংশ এবং এলএনজির ১৯ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হয়।
ইউএনসিট্যাড বলেছে, জ্বালানি, সার ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে এবং বিশেষ করে দরিদ্রদের জন্য জীবনধারণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংস্থাটির মতে, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশিয়ায়। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত পণ্যের প্রায় ৮৪ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোতে পৌঁছায়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা তেলের প্রধান এশিয়ান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথে তেল রপ্তানি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেই সুযোগ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরকে সংযুক্ত করে, যা হরমুজ প্রণালি এড়ানোর অন্যতম পথ। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেলই এই প্রণালি দিয়ে গেছে।
কার্বনচেইনের সরবরাহ শৃঙ্খলবিষয়ক বিশ্লেষক ইসমাইল জাবিয়েভ আলজাজিরাকে বলেন, ‘মূল বিষয়টি হলো ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালি ও সস্তা ড্রোনের কথা ভাবুন। এখানে প্রত্যক্ষ অবরোধ নেই। ইরান সমুদ্রের ওপর দেয়াল তোলেনি। কিন্তু ঝুঁকি রয়েছে। সব ড্রোন ঘাঁটি ধ্বংস হলেও গোপনভাবে ড্রোন হামলা চালানো সম্ভব। তাই সংঘাত চলতে থাকলে সরবরাহ ব্যাহত হবেই।’
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাভেকাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলো সর্বোচ্চ অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল অন্যপথে পরিবহন করতে পারবে। কিন্তু তবুও যদি বেশির ভাগ ট্যাংকার চলাচল বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে খাদ্যের দাম কেন বাড়ে
তেলের দাম ও খাদ্যের দাম প্রায় একইসঙ্গে ওঠানামা করে। কারণ, ক্ষেতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে ট্রাকে করে খাবার পরিবহন পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির প্রভাব রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও সরাসরি বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো পরিবহন। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া, এটাই মূল বিষয়। এটি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিকসের সমস্যা, আর পরিবহনই হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির জ্বালানি।’
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন—তেলের বাজারে বড় ধাক্কার পর ইতিহাসে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে। কারণ, এসব দেশে মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্যে এবং অনেক দেশকে বিপুল পরিমাণ শস্য ও সার আমদানি করতে হয়। এসব কারণে তেলের দাম বাড়লে সেখানে খাদ্যসংকট দ্রুত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।