আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার/ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের লাগাম টানছে প্রতিনিধি পরিষদ, আসলেই কোনো লাভ হবে?

ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপের লাগাম টানতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
বুধবারের (৩ জুন) এই ভোটকে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে আইনপ্রণেতাদের প্রথম বড় ধরনের সফল প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এমন এক সময়ে এই ভোটাভুটি হলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে এবং শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে।
গত চার মাসের এই সংঘাতের ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু ডেমোক্র্যাটরাই নয়, খোদ ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। আমেরিকানদের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ট্রাম্পের ব্যর্থতাই এর মূল কারণ।
কিন্তু আপাতত, এই ভোটটি মূলত প্রতীকীই থেকে যাবে। কারণ যে কোনো নতুন আইন বাতিলের জন্য ট্রাম্পের নিজস্ব ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, আর মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটেও তার দল রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তবে এই ভোটটি ট্রাম্পের নীতির প্রতি আইনপ্রণেতাদের একটি বড় ধরনের ধিক্কার বা প্রতিবাদ।
কী হয়েছে?
বুধবার ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতারা ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ প্রয়োগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই আইন অনুযায়ী, বিদেশে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে প্রবেশের পর প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে, কংগ্রেস সেই সংঘাত বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তি দিয়ে আসছে যে, যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার প্রেসিডেন্টের নয়, বরং কংগ্রেসের। এই যুক্তির ভিত্তিতে তারা বারবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।
তবে, ট্রাম্প প্রশাসন পাল্টা যুক্তি দিয়েছে দাবি করেছে, ইরানে সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
১৯৭৩ সাল থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, সশস্ত্র সংঘাতে প্রবেশের আগে প্রেসিডেন্টকে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন নিতে হয়। কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন আক্রমণের ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সৈন্য মোতায়েন করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হবে।
মার্কিন নিয়ম অনুযায়ী, কংগ্রেস যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধে নামার ৬০ দিনের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমালোচকদের স্পষ্ট যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাৎক্ষণিক কোনো বড় বিপদ বা হুমকি ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই আগে ইরানে আঘাত হেনেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস) সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাট সদস্যরা যুদ্ধ থামানোর এই আইনটি তিনবার কার্যকরের চেষ্টা করেন। তবে তাদের আগের সব প্রচেষ্টাই ভেস্তে যায়।
এরই মধ্যে যুদ্ধের ৬০ দিন পেরিয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী গত ২৯ এপ্রিলের মধ্যেই মোতায়েন করা হাজার হাজার মার্কিন সেনা ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সৈন্য প্রত্যাহার করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
হাউস কীভাবে ভোট দিয়েছে?
বুধবারের ভোট গণনায় ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতিকে সংযত করার প্রস্তাবের পক্ষে ২১৫টি ও বিপক্ষে ২০৮টি ভোট পড়ে। প্রস্তাবটি পাসের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্য এনে দিয়েছেন চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। ট্রাম্পের নীতির প্রতি প্রকাশ্য ক্ষোভ জানিয়ে তারা নিজস্ব দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
দুই সপ্তাহ আগের ভোটাভুটিতে প্রথম দলীয় সীমারেখা ভেঙেছিলেন তিন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা; তারা হলেন মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন ও কেন্টাকির টমাস ম্যাসি। বুধবার তাদের সঙ্গে চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে যোগ দেন পেনসিলভেনিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
যুদ্ধের শুরুতে রিপাবলিকানরা প্রকাশ্যে এটিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করলেও, বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খোদ ট্রাম্পের দলেই মনোভাবের এই বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন জনগণের কাছে ট্রাম্পের নিজস্ব জনপ্রিয়তাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই ভোট কি ট্রাম্পের ক্ষমতা কমাতে পারবে?
না, এখনই তা হচ্ছে না। এই মুহূর্তে এই ‘হ্যাঁ’ ভোটটি মূলত একটি ‘প্রতীকী’ চাপ মাত্র। কারণ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করতে হলে মার্কিন সিনেটেও এটি পাস হতে হবে। তবে উচ্চকক্ষ বা সিনেটেও ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, যার ফলে এটি সেখানে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
যদিও সিনেটের ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার প্রক্রিয়া শুরু করতে ভোটের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন, সিনেটের রিপাবলিকানরা এ পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করার জন্য যথেষ্ট ভোট জোগাড় করতে পেরেছেন।
প্রস্থান প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বশেষ ভোটটি দুই সপ্তাহ আগে ১০০ সদস্যের সিনেটে ৫০-৪৭ ভোটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে পক্ষে ভোট দেন, অন্যদিকে পেনসিলভেনিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যানই একমাত্র ডেমোক্র্যাট, যিনি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।
যদিও ফলাফলে রিপাবলিকান সিনেটরদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রতিফলিত হয়েছিল, কিন্তু এই সংখ্যা যথেষ্ট ছিল না। হাউসের পথ অনুসরণ করে সিনেট যদি ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তবুও ট্রাম্প প্রস্তাবটিতে ভেটো দিতে পারেন।
সেক্ষেত্রে, প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে কংগ্রেসকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলটি পাস করতে হবে। এটা অসম্ভব নয়। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অবাস্তব হতে পারে; অর্থাৎ কিছু রিপাবলিকান অসন্তুষ্ট হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠরা এখনও প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সমর্থন করেন।
যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই যুদ্ধে লিপ্ত?
এরপর প্রশ্ন ওঠে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে আদৌ যুদ্ধে লিপ্ত আছে কি না এবং প্রস্তাবটি আদৌ প্রযোজ্য কি না। গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যদিও তা ভঙ্গুর। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত নেই।
গত ১ মে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিকে শত্রুতার ‘অবসান’ হিসেবে ঘোষণা করেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রেখেছে এবং ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তেহরানও হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার ও বুধবার যুদ্ধসংক্রান্ত একাধিক শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের মুখোমুখি হয়ে এই যুক্তিটি উত্থাপন করেন। আইনপ্রণেতারা তাকে ইরানের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার মার্কিন পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও তথ্য জমা দিতে এবং ভেনিজুয়েলার জন্য পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে জানাতে আহ্বান জানান।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকারের সঙ্গে এক তীব্র বিতর্কে রুবিও ঘোষণা করেন, ‘ইরান যুদ্ধ শেষ’।
তবে সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য সিনেটর জেন শাহিন রুবিওর বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার অভাব ও কংগ্রেসকে সঠিক তথ্য প্রদানে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, আপনারা কংগ্রেসকে যুদ্ধ ক্ষমতাসংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বলেছেন যে, আমরা ইরানের সঙ্গে সক্রিয় সংঘাতে লিপ্ত নই, অথচ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছিল এবং ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও ঘাঁটিগুলোতে বোমা বর্ষণ করছিল।
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে পারে?
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কিছু কর্মকর্তা এমনটাই মনে করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ১২ মে দাবি করেছেন যে, যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের অধীনে সৈন্য মোতায়েনের জন্য প্রেসিডেন্টকে দেওয়া ৬০ দিনের সময়সীমার অর্থ হলো, প্রশাসন আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরু করতে পারে।
সিনেট বরাদ্দ কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হেগসেথ মূলত যুক্তি দেন, গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি মূল সময়সীমাগুলোকে নতুন করে নির্ধারণ করেছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট যদি (ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ) পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তা করার জন্য আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় সমস্ত ক্ষমতা থাকবে।


