logo

ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি পারছেন না স্পষ্ট জয়ের ঘোষণা দিতে, তেমনি যুদ্ধের বিস্তারও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ করার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি হবে ভয়াবহ। হতে পারে তা বর্তমানে যুদ্ধে অবস্থান করার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

যদিও ট্রাম্প এখনও পূর্ববর্তী মার্কিন নেতা লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো চরম হতাশাজনক অবস্থায় পড়েননি, তবে বিপদের সংকেত সবখানেই স্পষ্ট। গত দুই সপ্তাহের যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে— আর তা হলো ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এই অঞ্চলটি বিশ্বের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান পথ। ইরানের এই পাল্টা পদক্ষেপ প্রমাণ করে, আমেরিকার বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও সবকিছু কেবল শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করা যায় না।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পের জন্য একপ্রকার সামরিক ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইরান সামরিক শক্তিতে তুলনামূলক অনেক পিছিয়ে, তবুও মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, ট্রাম্প কোনো গভীর চিন্তাভাবনা ছাড়াই কেবল নিজের ‘মনগড়া ভাবনার’ ওপর ভিত্তি করে এই যুদ্ধ শুরু করেছেন। অথচ মার্কিনিরা কয়েক দশক ধরেই জানেন, আক্রমণ করা হলে ইরান ঠিক এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাবে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘আপনি যদি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারেন, তবে জয়ের ঘোষণা দেওয়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এটি পুনরায় উন্মুক্ত করা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অসম্ভবও বটে। এই যুদ্ধ প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে।’

যুদ্ধের এই প্রভাব কেবল তেলের দাম বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ইরাকে একটি মার্কিন ট্যাংকার বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়লে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশের ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকটি পুনরায় সামনে আসে। ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে ১৩ মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে।

হাজার মাইল দূরে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের আঁচ এবার খোদ আমেরিকার মাটিতেও অনুভূত হতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার ভার্জিনিয়া এবং মিশিগানে ঘটে যাওয়া দুটি সহিংস ঘটনা মার্কিন নাগরিকদের মনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যদিও এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইরান যুদ্ধের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবুও চরম উত্তেজনার এই সময়ে ভার্জিনিয়ার গোলাগুলিকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে দেখছেন তদন্তকারীরা। অন্যদিকে, মিশিগানে একটি সিনাগগে (ইহুদি উপাসনালয়) গাড়ি তুলে দেওয়ার ঘটনাকে এফবিআই ‘ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

হোয়াইট হাউস থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করার মাধ্যমে আমেরিকানদের নিরাপদ করা হয়েছে। তবে দেশের ভেতরের এই অস্থিতিশীল পরিবেশ সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সুরে বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধে খুব দ্রুত এবং সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের সামরিক শক্তি অতুলনীয়।’

তবে ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসের সুরের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ ‘এপিক ফেইলর’ তথা মহাব্যর্থতায় পরিণত হলো কি না। যদিও একবারে ব্যর্থতা বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলাগুলো কৌশলগতভাবে বেশ সফল। এতে ইরানের সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা যেমন কমেছে, তেমনি তাদের ড্রোন ও মিসাইল তৈরির ভাণ্ডারও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানের মিসাইল হামলার গতিও ধীর হয়ে এসেছে।

প্রত্যেক যুদ্ধেই প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয়। তবে ইরানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধের তুলনায় ইরাক ও আফগানিস্তান দখলের সময় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ছিল অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ সতর্কতায় বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন যে, তিনি আমেরিকাকে ওই ধরনের কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চোরাবালিতে ফেলতে চান না। যুদ্ধ সবসময়ই আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়, তাই বাস্তব সময়ে এর ফলাফল বিচার করা অত্যন্ত কঠিন।

এদিকে ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতার মনোনয়ন ইরানের ৫০ বছরের ইসলামি শাসন পতনের মার্কিন আশা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবে নতুন নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে না এসে বিবৃতিতে বক্তব্য প্রদান করায় ইরানের শাসনে স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো রে তাকেহ এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আজকের মূল্যায়ন হয়তো আগামী কয়েক মাস পর কার্যকর থাকবে না। এটি একটি গতিশীল পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিদিন আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই সংকটে টিকে থাকতে হলে চরম বুদ্ধিবৃত্তিক নমনীয়তা প্রয়োজন।’

যেভাবে ট্রাম্প ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি 

ডোনাল্ড ট্রাম্প পেশায় একজন ব্যবসায়ী। আজীবন ব্যবসায়িক কৌশলে অভ্যস্ত ট্রাম্প যে কোনো কিছুকে বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। গত বুধবার কেন্টাকিতে দেওয়া এক ভাষণে তিনি সগর্বে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি বলতে চাই, আমরা জিতে গেছি। যদিও সময়ের আগে জয়ী বলাটা ঠিক নয়, তবুও আমরা জিতেছি। যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টাতেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জয় আমাদেরই হয়েছে।’

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বয়ানের ঠিক উল্টো।  আমেরিকা এখনো জয়ের মুখ দেখেনি; বরং জটিলতা দিন দিন আরও বাড়ছে। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জয়ী না হওয়ার সাতটি কারণ রয়েছে— 

হরমুজ প্রণালি: এক দুর্ভেদ্য বাধা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান কৌশলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যুদ্ধের মধ্যে ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি কার্যত অচল করে দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলের ট্যাংকারে হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং সাধারণ মানুষের জন্য পেট্রোলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। ইরানের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং ড্রোন হামলার ভয়ে মার্কিন নৌবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে প্রবেশ করতে আশঙ্কায় রয়েছে। জাহাজ চলাচলের বিমা খরচও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে দ্রুত এই প্রণালি উন্মুক্ত করার কোনো সহজ সমাধান আপাতত নেই। যদি কোনোভাবে এটি পুনরায় চালুও করা হয়, তবে প্রতিটি জাহাজকে সার্বক্ষণিক পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, যা বর্তমানে ক্লান্ত ও সীমিত সংখ্যার পশ্চিমা নৌবাহিনীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

সামরিক নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সামরিক বিশ্লেষণ পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, ‘বলপ্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলার কোনো উপায় নেই। কারণ ইরান খুব সামান্য মূল্যের কিছু সস্তা ড্রোন ব্যবহার করেই এটি বন্ধ রাখতে পারে।’

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই অনেক বিশেষজ্ঞ এই বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল অবকাঠামো বা পারমাণবিক কর্মসূচি—এসবই রাজনৈতিক সমস্যা এবং এর সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক। কাভানাঘের মতে, ‘এর কোনো সামরিক সমাধান নেই। কারণ আপনি আজ এটি জোর করে খুললেও, কাল সেটি খোলা থাকবে—তার গ্যারান্টি কে দেবে?’

ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন, অন্যদিকে তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে এই অচলাবস্থা কাটানোর কোনো সহজ পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

ইরানের নতুন নেতৃত্ব ট্রাম্পের জন্য নতুন মাথাব্যথা

মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের শুরুতেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড এই সংঘাতকে সরাসরি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা পরবর্তীতে এই লক্ষ্যকে কিছুটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তবুও খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া ট্রাম্পের সাফল্যের দাবিকে ম্লান করে দিয়েছে। এ ঘটনা ডেমোক্র্যাটদের জন্য অপারেশন এপিক ফিউরিকে একটি সামরিক সাফল্য কিন্তু কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।

মোজতবা খামেনি

মেরিন কর্পসের প্রাক্তন সদস্য ও ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি জেক অচিনক্লস সিএনএনকে বলেছেন, ‘ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা তার বাবার চেয়েও আরও বেশি চরমপন্থি এবং কঠোর।’

যুদ্ধ কি থামাবে ইসরায়েল?

ট্রাম্প যদি রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ শেষ করতেও চান, তবে ইসরায়েল তাতে একমত হবে কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অভ্যস্ত। সম্প্রতি ইরানের তেল অবকাঠামোতে ইসরায়েলের বোমা হামলার পর এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য আলাদা হতে পারে।

গত রোববার ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা তার এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি যৌথ সিদ্ধান্ত হবে। এই মন্তব্য নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, একজন মার্কিন কমান্ডারের সামরিক সিদ্ধান্তে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায্য প্রভাব কাজ করছে। গাজা, লেবানন, ইরান এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের ঘনঘন সামরিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে একটি ‘নিরবচ্ছিন্ন মিশন’ হিসেবে দেখে। ইসরায়েলের এমন অবস্থানে ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত ‘বিজয়ী সমাপ্তির’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

যুদ্ধের অস্পষ্ট লক্ষ্য 

ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ জয়ের বর্ণনায় ক্রমাগত বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্য ধরা পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় একটি সুসংগত ‘বিজয়গাথা’ তৈরি করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

পারমাণবিক প্রশ্ন: আদৌ কি ধ্বংস হয়েছে?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করেছেন। এই দাবি তিনি গত বছরের জুনে বিমান হামলার পরও দাবি করেছিলেন। কিন্তু ইরান যদি তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালু করার তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে গুঞ্জন উঠেছিল, ট্রাম্প হয়তো তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো জব্দ করার জন্য একটি বিশেষ কমান্ডো অভিযানের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এর জন্য বিশাল স্থলবাহিনী এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ একটি মিশনের প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে স্থল অভিযানের জন্য শনিবার (১৪ মার্চ) ট্রাম্প ২৫০০ মার্কিন সেনা পাঠাচ্ছে ইরানে।

ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদের ফারদো চুল্লি

জাতিসংঘ পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে এখনও প্রায় ২০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই মজুত পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন কখনোই ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারবে না।

ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতা

যুদ্ধের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে এক বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ তার দাবি ছিল, ইরানের ধর্মতান্ত্রিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এটিই তাদের জন্য জীবনের সেরা সুযোগ। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পের সেই আশার সঙ্গে মিলছে না।

এখন পর্যন্ত ইরানে বড় ধরনের কোনো গণঅভ্যুত্থান বা বিদ্রোহের প্রকাশ্য লক্ষণ দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখনই আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিমান হামলা বন্ধ হবে, ইরান সরকার হয়তো আগের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুরভাবে সাধারণ মানুষের ওপর ‘দমন-পীড়ন’ শুরু করবে।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হুমকি কমিয়ে আনা একটি কৌশলগত বিজয়; তবে তা যুদ্ধের শুরুতে দেওয়া ট্রাম্পের সেই উচ্চাভিলাষী ‘মুক্তির বার্তার’ ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারবে না। অর্থাৎ, সামরিক জয় এলেও রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ইরানে এখনও সুদূরপরাহত।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এখন সময়ের পরীক্ষা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই প্রভাব থেমে নেই। মার্কিন প্রশাসন জনগণকে আশ্বস্ত করছেন যে, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি কেবল সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য এই ‘স্বল্পমেয়াদি কষ্ট’ মেনে নেওয়া প্রয়োজন। 

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ আমেরিকানদের কাছে ইরানের পারমাণবিক বোমার চেয়েও বড় চিন্তার বিষয় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়। ইসরায়েলের কাছে এটি অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন হতে পারে, কিন্তু মার্কিন ভোটারদের কাছে আকাশচুম্বী তেলের দাম আর টানাপোড়েনের সংসার সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নিহত মার্কিন সেনাসদস্যদের জন্য শোক এবং দৈনন্দিন খরচের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ এখন ট্রাম্পের ‘বিজয়োল্লাস’ ভাগ করে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দামে বৃদ্ধি

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনী বা সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার জয়ের মতো দ্ব্যর্থহীন বিজয় বর্তমান সময়ের যুদ্ধগুলোতে বিরল। ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা জয়ের চেয়ে পরাজয় বা অমীমাংসিত যুদ্ধের স্বাদই বেশি পেয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিজের বেছে নেওয়া একটি যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি। সামরিক শক্তির প্রাথমিক দাপট কমে যাওয়ার আগেই তাকে একটি সম্মানজনক জয় নিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায়, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ যদি দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের বা ধৈর্যের পরীক্ষায় মেতে ওঠে, তবে আমেরিকার জন্য এই যুদ্ধ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক: সিএনএন রাজনৈতিক বিটের সিনিয়র রিপোর্টার 

সিএনএনের পলিটিক্স বিভাগ থেকে অনূদিত