বিদায়, শংকর!

নব্বই দশকের ছেলেমেয়েদের এখনো মনে থাকার কথা। ড্রইংরুমের শোকেস বা বুকশেলফে যেসব বই সারি সারি করে যত্নে সাজিয়ে রাখা, তার মধ্যে কিছু কিছু ছোটদের পড়া বারণ! অগ্রজরা বলতেন, বড় হলে এগুলো পড়া যাবে। সে সময় থেকে কিছু নাম চিনে ওঠা—সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, বুদ্ধদেব, নিমাই।
এবং অবশ্যই—শংকর।
অন্যদের পুরো নাম বইয়ের ফ্ল্যাপে থাকলেও, ওনার নামটা এক শব্দেই। হয়তো সে কারণেই আজ প্রথম জানবেন তার পূর্ণাঙ্গ নাম—মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তিরিশের দশকে যশোরে জন্ম, পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসার সুবাদে শংকর ওপার বাংলার মানুষ হিসেবেই আজন্ম পরিচিত হয়ে উঠলেন। সদ্য তরুণ বয়সেই ‘কত অজানারে; উপন্যাস দিয়ে পেলেন দারুণ জনপ্রিয়তা। ঋত্বিক ঘটক সে গল্প থেকে সিনেমা করতে চেয়েছিলেন, তবে অর্থাভাব ও অন্যান্য জটিলতায় সেটি ঠিক আলোর মুখ দেখেনি।
সত্যজিতের ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’র ক্ষেত্রে অবশ্য তেমন ঘটেনি। শংকর যে নির্মোহভাবে উত্তাল সময়ের কলকাতার গল্প বলেছেন, সত্যজিতও নিজের গেঁড়ে বসা স্টাইল থেকে উঠে এসে বানিয়েছেন এই সিনেমাগুলো। কলকাতা ট্রিলজির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এই সিনেমা দুটি শংকরকে চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবে পাকাপোক্ত করে। সত্যজিত, ঋত্বিক ছাড়াও তপন সিংহ তার উপন্যাস থেকে তৈরি করেছিলেন ‘এক যে ছিল দেশ’, সেটিও গল্পের মতোই দুর্দান্ত এক সিনেমা ছিল।
তবে শংকর বলতেই যে বইটি, কিংবা সিনেমার কথা আমাদের মাথায় সবার আগে চলে আসে, সেটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘চৌরঙ্গী’। ১৯৬৮ সালে সে কাহিনি থেকে সিনেমা হলো, রীতিমতো তারকাখচিত, আলোচিতও বটে। নায়ককে ছাপিয়ে খানিকটা পার্শ্বীয় চরিত্রে উত্তম কুমারের সত্য থেকে ’স্যাটা বোস’ হয়ে ওঠা চৌরঙ্গীর সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডিং। যেভাবে মনিশংকর মুখোপাধ্যায়ও নিজের পুরো নাম আরেক পাশে রেখে শংকর হয়েই পাঠক আর ভক্তদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন!
আলোচিত বইগুলো ছাড়াও, শংকর মূলত ছিলেন নিয়মিত লেখক। অগুণতি বই লিখেছেন। চাকরি করে গেছেন। সাহিত্যকর্মের জন্য পেয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননা। বার্ধক্যর কাছেই শেষটায় হার মেনে ৯৩ বছর বয়সে চলে গেলেন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘শংকর চলে গেছেন শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পৌনে ১টা নাগাদ। নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন পনেরো আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এ সাহিত্যিক। হাসপাতালেই মারা যান শংকর।’
শংকর চলে গেলেও তার কাজগুলো থেকে গেল। আজ বা আগামীতেও কিছু কিছু মানুষ—যারা বই পড়তে ভালোবাসবে, শংকর নিশ্চয়ই তাদের কাছে আপনজন হয়ে উঠবেন।