logo

জেনেভায় অগ্রগতি, তবু অনিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ

জেনেভায় অগ্রগতি, তবু অনিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণু আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে কোনো চুক্তি হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জানান, দুই পক্ষ নিজ নিজ রাজধানীতে পরামর্শ শেষে ‘শিগগিরই’ আবার আলোচনায় বসবে। আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

আগের দফার মতোই ইরান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

আলোচনা শেষে আব্বাস আরাঘচি বলেন, আমি বলতে পারি, আজ আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘতম আলোচনার একটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকটি সকালে প্রায় চার ঘণ্টা ও বিকেলে দুই ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। 

তিনি বলেন, কিছু বিষয়ে বোঝাপড়া খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। অবশ্যই এখনও কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, যা স্বাভাবিক। তবে অতীতের তুলনায়, উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর ব্যাপারে আরও বেশি গুরুত্বারোপ করছে। পরবর্তী দফায় আলোচনা সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—চুক্তি না হলে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি ছিল তৃতীয় দফা আলোচনা, যা অনেকের কাছে শেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানও বলেছে, হামলা হলে জোরাল জবাব দেওয়া হবে।

তবে আলোচনায় ট্রাম্প ঠিক কী শর্ত চাইছেন, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি। উল্লেখ্য, গত বছর ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, আলোচনায় ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি ব্যবহারের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে কর্মকর্তারা কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। বিনিময়ে ইরান চায় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। বিরোধীরা বলছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে শাসকগোষ্ঠী নতুন জীবনরেখা পাবে।

ট্রাম্প কোন শর্তে রাজি হবেন, তা এখনও অনিশ্চিত। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা বা গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে বিভিন্ন মিলিশিয়া ও ইয়েমেনে হুতিদের প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়ে আলোচনা করবে না।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হাজারো মার্কিন সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরীসহ বড় নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পুরোনো বিরোধ

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। ইরান বরাবরই বলেছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। যদিও অস্ত্রধারী নয়—এমন দেশগুলোর মধ্যে ইরানই একমাত্র, যারা প্রায় অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

ইরান বলছে, হামলার পর সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

ট্রাম্প কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে বলেন, ইরান এখনও প্রকাশ্যে বলেনি— আমরা কখনোই পরমাণু অস্ত্র বানাব না। তবে এই ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে আরাঘচি সামাজিকমাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না এবং পারস্পরিক স্বার্থরক্ষাকারী একটি ঐতিহাসিক চুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সম্ভাব্য প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

জেনেভার আলোচনায় আঞ্চলিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম গঠনের প্রস্তাব এবং প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে করণীয়, তদারকি ও যাচাই ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের বিপ্লবী গার্ড বা পরমাণু স্থাপনায় সীমিত হামলার কথা বিবেচনা করছেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেও অভিযান চালানো হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করেছেন, ইরানে হামলা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এতে সহজেই জেতা যাবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যেও চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রভান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইসরায়েলের কাছেও পরমাণু অস্ত্র থাকলেও দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার বা অস্বীকার করে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের নিয়ে গঠিত তথাকথিত ‘গ্যাং অব এইট’কে গোপন ব্রিফিং দিয়েছেন।

ব্রিফিং শেষে সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। প্রশাসনকে আমেরিকান জনগণের কাছে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।