হরমুজ চালু না করেই যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত ট্রাম্প

ইরানের উপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের চলমান হামলা এক মাস ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি সচল না হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইরানে সামরিক অভিযান সমাপ্ত করতে ইচ্ছুক। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার পরামর্শদাতারা মূল্যায়ন করেছেন যে, শক্তি প্রয়োগ করে এই সংকীর্ণ জলপথটি উন্মুক্ত করার অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা তার নির্ধারিত চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমাকে অতিক্রম করবে। তাই প্রণালিটি সচল করার জটিল প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখে বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন ইরানের নৌ-শক্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করার প্রাথমিক লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। যেখানে দিয়ে বৈশ্বিক তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত ও ইরাকের এই প্রণালিতে নিজস্ব জলসীমা থাকলেও, অপর প্রান্তে ইরানের উপস্থিতির কারণে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান চাইলে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে ওয়াশিংটন আশা করছে ইউরোপীয় মিত্র এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এই নৌপথ সচল করার অভিযানে মূল নেতৃত্ব দেবে। বর্তমানে সামরিক অভিযানের বিষয়টি থাকলেও তা ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার নয়।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘসময় বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিকাজের সার ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় হিলিয়াম গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি দ্রুত এই নৌপথ উন্মুক্ত না করে, তবে আমেরিকা ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তেলকূপগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। মূলত আমেরিকার শান্তি প্রস্তাবকে ইরান অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করার পর এই হুঁশিয়ারি আসে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোঁড়া দুটি ড্রোন ইসরায়েল ভূপাতিত করেছে। এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীও ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের সামরিক স্থাপনা ও বৈরুতে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালিয়েছে।
একই দিনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা বলেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সামরিক অভিযান ছাড়াই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের পাইপলাইনগুলো ইরান নিয়ন্ত্রিত এলাকা এড়িয়ে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর অভিমুখে ঘুরিয়ে দিলে তেহরানের ভৌগোলিক একক আধিপত্য নষ্ট হবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এক মাসব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবুও তেহরান এখনো তাদের অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।