খামেনির মৃত্যু, কে ধরছেন ইরানের হাল

ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তেহরান। এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়েছে।
রোববার (১ মার্চ) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। খামেনির মৃত্যুতে দেশজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় গণশোক ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাজপথে নেমে শোক প্রকাশ করছেন। শোকে স্তব্ধ বহু ইরানি। এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ‘মহান নেতা’কে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব কীভাবে গঠিত হবে, তা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছিল। তার মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার দুটি সূত্র জানিয়েছে, খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আইআরজিসির কট্টরপন্থি নেতারা সামনে আসতে পারেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ইরানের সংবিধানে এমন পরিস্থিতির জন্য স্পষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে অস্থায়ীভাবে তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেবে। এতে থাকবেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ধর্মীয় সদস্য। পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই কাউন্সিল দেশ পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এদিকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানিকে বাড়তি কর্তৃত্ব দেওয়ার খবরও ঘুরে বেড়াচ্ছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, আয়াতুল্লাহ খামেনি হামলা বা গুপ্তহত্যার কার হলে পশ্চিম এশিয়ার প্রতাবশালী দেশ ইরানকে টিকিয়ে রাখতে দেশকে নেতৃত্বে দেবেন জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান। খামেনি নিজেই এ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলা বা গুপ্তহত্যার আশঙ্কা থাকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশকে টিকিয়ে রাখতে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিবেদনে আইআরজিসি কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্যের বরাত দেওয়া হয়েছে।
খামেনি তেহরানের শাসনব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দ্রুত প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি রাখা। যদি তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় বা তাকে হত্যা করা হয়, সেক্ষেত্রে দায়িত্ব যাবে তার ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের একটি গোষ্ঠীর হাতে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের কাছ থেকে পাওয়া।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা বা শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে আলী লারিজানির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত আগস্টে তাকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়। মূলত এই পরিষদই দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলার দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) একটি মূল্যায়ন করেছিল। সেখানে বলা হয়, খামেনি নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বিপ্লবী গার্ডের কট্টরপন্থী নেতারা। এই বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ইরানে শিয়া ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা অটুট রাখা।
মার্কিন হস্তক্ষেপের পর ইরানের অভ্যন্তরে কী ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং সামরিক অভিযান শাসনব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে—সে বিষয়েও ওই মূল্যায়নে বিশদ বিশ্লেষণ ছিল বলে জানা গেছে। তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে বিপ্লবী গার্ডের সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের চিত্রও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তবে সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।