সৌদির কাছে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা কেন বিতর্কিত

সৌদি আরবের কাছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদ এই অত্যাধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টা করলেও ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার মার্কিন নীতির কারণে এতদিন তা আটকে ছিল।
এফ-৩৫ বিশ্বের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান। এর স্টেলথ প্রযুক্তি শত্রুর রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। সৌদি আরবকে এই বিমান সরবরাহের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বিক্রয়ের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছেন, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি চীনের নাগালের মধ্যে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যান্য ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং কিছু প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারও আশঙ্কা, চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে সংবেদনশীল প্রযুক্তি বেইজিংয়ের হাতে পৌঁছাতে পারে।
প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রয় পর্যালোচনা বা আটকে দেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের হাতে ৩০ দিন সময় রয়েছে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের দাবি, প্রস্তাবিত অস্ত্র ও সহায়তা সরবরাহের ফলে ওই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন হবে না।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতাদের একটি। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত নভেম্বরে যুবরাজ ওয়াশিংটন সফর করেন। এর আগে গত বছরের মে মাসে রিয়াদে দুই নেতার বৈঠকে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটিকে হোয়াইট হাউস ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বিক্রয় চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
সৌদি আরবের জন্য প্রস্তাবিত নতুন প্যাকেজে লকহিড মার্টিনের তৈরি ৪৮টি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান রয়েছে। একটি এফ-৩৫এ-এর দাম প্রায় ৮২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। এই বিমানগুলো সরবরাহ করা হলে সৌদি আরবের এফ-৩৫ বহর ইসরায়েলের বর্তমান বহরের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
ইসরায়েল বর্তমানে প্রায় ৫০টি এফ-৩৫ পরিচালনা করছে। তবে গত মে মাসে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও একটি স্কোয়াড্রন কেনার ঘোষণা দেয়। জেরুজালেম পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের এফ-৩৫ বহর ১০০টির মতো হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির অংশ। মার্কিন আইনে ইসরায়েলকে এমন সামরিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে আঞ্চলিক অন্য কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র পেলেও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকে।
২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পরও রিয়াদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে এর সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি যুক্ত ছিল। সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
এদিকে ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনার মধ্যেই এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাবটি সামনে এসেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িত। সম্প্রতি হুথিরা সৌদি সমর্থিত সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাতে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। তবে সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ওই সংঘাতে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেননি।


