logo

প্রেমিক-প্রেমিকাই নয়, একাকিত্ব ঘোচাতে ভাড়ায় মিলছে সন্তানও

প্রেমিক-প্রেমিকাই নয়, একাকিত্ব ঘোচাতে ভাড়ায় মিলছে সন্তানও
বেইজিংয়ের বাসিন্দা ইয়াং একাকিত্ব ঘোচাতে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করেন সন্তান। ছবি: বিবিসি

ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা বা জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ। এ জন্য রয়েছে নানা ধরনে অ্যাপ। সেসব অ্যাপ ব্যবহার করলেই ভার্চ্যুয়াল বন্ধু কিংবা প্রেমের মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু এত সুযোগের পরও চীনের অনেক মানুষ অর্থ খরচ করে ভাড়া করছেন বন্ধু, সঙ্গী, এমনকি পরিবারের সদস্যও। এই তালিকায় রয়েছে ভাড়া করা সন্তানও।

বিষয়টি শুনে মনে হতে পারে, কেবল তরুণেরাই হয়তো টাকা দিয়ে বন্ধু কেনার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তরুণদের তুলনায় প্রবীনদের মধ্যেই বন্ধু ভাড়া করার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ একাকিত্ব।

ভারতের সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার অনলাইন তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চীনে জন্মহার ক্রমাগত কমছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে জন্মহার কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩ জনে। ১৯৪৯ সালের পর এই হার সর্বনিম্ন। অন্যদিকে বেড়েছে মৃত্যুহার। টানা চার বছর ধরে দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।

একইসঙ্গে তরুণদের মধ্যে বিয়ের আগ্রহও কমছে। ২০২২ সালে চীনে বিয়ে করেছিলেন ৬৮ লাখ ৩০ হাজার যুগল, যা ১৯৮৬ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৭ লাখ। দেশটিতে বিয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল ২০১৩ সালে। ওই বছর বিয়ে করেছিলেন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ যুগল। এরপর থেকে বিয়ের নিবন্ধন ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

যারা বিয়ে করছেন, তাদের মধ্যেও তুলনামূলক বেশি বয়সে সংসার শুরু করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তরুণদের বিয়েতে অনীহা ও জন্মহার কমে যাওয়ায় দেশটিতে বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ছে। জনসংখ্যার এই পরিবর্তন একদিকে চীন সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রবীণদের মধ্যে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা।

প্রবীণদের একাকিত্বের পেছনে চীনের সামাজিক কাঠামোরও ভূমিকা রয়েছে। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে অনেক তরুণ চাকরির সন্ধানে অন্য শহর বা এলাকায় চলে যান। তাদের অনেকে পরিবার ছেড়ে কর্মস্থলের কাছাকাছি বসবাস শুরু করেন। ফলে বাড়িতে একা থেকে যান বয়স্ক মা-বাবারা।

এই পরিস্থিতিতে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতাকে ঘিরে চীনে গড়ে উঠেছে নতুন এক অর্থনৈতিক খাত। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘একাকিত্বের অর্থনীতি’। এই খাতের আওতায় অর্থের বিনিময়ে ‘নকল সন্তান’ ভাড়া করছেন প্রবীণেরা। নিঃসঙ্গ জীবনে কথা বলার মতো একজন মানুষ পেতেই তারা এই সেবা নিচ্ছেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর ভাড়া করলেন সন্তান

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের বাসিন্দা ইয়াংয়ের বয়স ৯১ বছর। সম্প্রতি তার স্বামী মারা যান। এরপর থেকে একাকিত্ব এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে, ছেলের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন পযর্ন্ত করেছিলেন তিনি। গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়ায় দিন দিন তার দৃষ্টিশক্তিও কমে আসছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে ইয়াং জানান, ঘরের নীরবতা তাকে যেন গ্রাস করত। কথা বলার কেউ না থাকায় মাঝেমধ্যে টেলিভিমনের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি।

ইয়াংয়ের ছেলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র বসবাস করেন। মাঝেমধ্যে মাকে দেখতে আসনে। ফলে সময়ের সঙ্গে ইয়াংয়ের নিঃসঙ্গতা আরও বেড়েছে। একপর্যায়ে সঙ্গী পাওয়ার জন্য চীনের এই নতুন অর্থনীতির আশ্রয় নেন তিনি। অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করেন সন্তান।

শুধু ইয়াং নন, চীনে তার মতো হাজারো প্রবীণ মানুষ একই সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই এখন অস্থায়ী বা ‘নকল’ সন্তান ভাড়া করছেন। এ ধরনের সেবা দিতে দেশটিতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

এই অস্থায়ী সন্তানেরা প্রবীণদের সঙ্গে শুধু গল্প করেই সময় কাটান না। সন্তানেরা মা-বাবার জন্য সাধারণত যে ধরনের দায়িত্ব পালন করেন, সেগুলোও করেন তারা। বিনিময়ে পান নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক। স্মার্টফোন ব্যবহার শেখানো, শৌচাগারের কল মেরামত, মুদিদোকানের বাজার করা কিংবা রান্না করে দেওয়ার মতো কাজও করেন তারা।

প্রতিবার সেবা দেওয়ার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ২৯ থেকে ৮৮ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় করেন। তবে চীনের অর্থনীতিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বন্ধুও মিলছে ভাড়ায়

সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বন্ধুর ভূমিকাও পালন করছেন। ব্যস্ততার কারণে চীনের অনেক মানুষ বন্ধুত্ব ধরে রাখতে পারছেন না। নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগও তাঁদের কম। তাই একাকিত্ব কাটাতে অর্থের বিনিময়ে বন্ধু ভাড়া করছেন অনেকে।

রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, হাইকিং বা ট্রেকিং করা কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় এসব ভাড়া করা বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকাকে পাশে পাওয়া যায়। সন্তান ভাড়া করার তুলনায় প্রেমিক-প্রেমিকা বা বন্ধু ভাড়া করতে খরচও কম। প্রতিবার সেবা নেওয়ার জন্য ব্যয় করতে হয় ১৫ থেকে ২৫ মার্কিন ডলার।

চীনের তরুণদের মধ্যেও এ ধরনের সেবাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির ২৩ বছর বয়সী বাসিন্দা লিউ ইয়ানইয়ান ‘একাকিত্বের শিল্প’কেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অসুস্থ প্রবীণদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, তাদের রক্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন সংগ্রহ করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ করেন তিনি।

ইয়ানইয়ানের মতো আরও অনেক তরুণ এ ধরনের সেবাকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। প্রবীণদের একাকিত্ব তাদের জন্য তৈরি করছে আয়ের নতুন সুযোগ। অন্যদিকে, নিঃসঙ্গ জীবনে কিছুটা সঙ্গ ও স্বস্তি পাচ্ছেন বয়স্ক মানুষেরা।

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম

সম্পাদনা

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট