logo

এই দুর্দশায় কাকে পাশে পাবে ইরানের মানুষ

এই দুর্দশায় কাকে পাশে পাবে ইরানের মানুষ

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। দেশটিতে প্রতিনিয়ত হামলার খবর আসছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই বেসামরিক স্থাপনাও আঘাতের মুখে পড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরানে বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কথা বলা হচ্ছে, কিছু সূত্রে নিহতের সংখ্যা দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি। এই পরিস্থিতিতে ইরানের যুদ্ধ ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা নিয়ে লিখেছেন ইরানি সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী নাসরিন পারভেজ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তার কলামটি এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

একজন ইরানি হিসেবে আমি এই যুদ্ধ গভীর বেদনা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। একসময় ইরানের এই শাসনব্যবস্থা আমাকে কারাবন্দি করেছে, নির্যাতন করেছে। তখন থেকেই, আমি বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছি, তারা যেন ইরানের মানুষের দুর্দশার দিকে নজর রাখে। কিন্তু এখন যখন মার্কিন ইসরায়েলি বোমা বৃষ্টির মতো ইরানের জমিনে ঝরে পড়ছে, হাজারো নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে, আর কিছু ইরানি এই যুদ্ধে উল্লাস করছে, তখন আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।

পরিষ্কার করে বলা দরকার, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ শুরুর ষড়যন্ত্র করেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য ইরানের মানুষকে শাসনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করা ছিল না। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের বিষয়ে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘এই জোটের কারণে আমরা এমন কিছু করতে পারছি, যা করার জন্য আমি ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি।’ তিনি এই অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘লায়নস রোর’।

এদিকে কিছু ইরানি রাজতন্ত্রপন্থি শাহ আমলের মুকুটধারী সিংহ ও সূর্যের প্রতীকযুক্ত পতাকা উড়িয়ে এই হত্যাযজ্ঞ উদ্‌যাপন করছে।

ইরানিরা যখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে বেছে নিয়েছে, তখন নির্বাসনে থাকা আরেক ব্যক্তি রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি হলেন রেজা পাহলভি—সাবেক শাহর ছেলে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে যাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ইরানিরা এত সংগ্রাম করেছিল। এখন তিনি মনে করেন, দেশ পরিচালনায় তিনিই একমাত্র ‘উপযুক্ত’।

যুদ্ধ শুরুর পরদিন, ১ মার্চ তিনি টুইট করেন, ‘শাসনব্যবস্থার হামলায় নিহত তিন মার্কিন নায়কের জন্য আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে, আহত পাঁচজনের জন্যও। ইরানের জনগণ তাদের কাছে চিরঋণী।’

শোক প্রকাশের এই ভাষা শুনে মনে হয়, তিনি যেন আমেরিকান, ইরানি নন। সত্যিই যদি তিনি ইরানি হতেন, তাহলে সাম্প্রতিক হামলায় নিহত হাজার হাজার ইরানি বেসামরিক মানুষের জন্যও শোক প্রকাশ করতেন—যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক হামলায় নিহত অন্তত ১৫০ স্কুলশিক্ষার্থী শিশুও রয়েছে।

ইরানের ভেতরে যারা রাজতন্ত্রের পতাকা তুলছে, তাদের আমরা বিদেশে থাকা রাজতন্ত্রপন্থীদের মতো করে বিচার করতে পারি না। প্রবাসী অনেক রাজতন্ত্রপন্থি একসময় ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রক্ষীবাহিনীর অংশ ছিল, আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ তাদের আবার ক্ষমতায় আনতে পারে। কিন্তু ইরানের ভেতরের মানুষ আট বছর ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছে। তারা জানে, যুদ্ধ মানে কতটা ভয়াবহতা, যুদ্ধ মানে কত মৃত্যু।

পরে আবার শাসকগোষ্ঠীর হাতেও তারা বারবার নিপীড়িত হয়েছে। ডুবে যাওয়া মানুষ যেমন বাঁচতে গিয়ে খড়কুটাকেও আঁকড়ে ধরে, তেমনি কিছু মানুষ পাহলভিকেও আশ্রয় হিসেবে দেখছে।

১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তাতে পাহলভির বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতায় বসেন। এখন যেন আবার তেমন কিছু ঘটানোর চেষ্টাই দেখা যাচ্ছে।

ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও পাহলভি আবারও ইরানের জনগণকে বিদ্রোহে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আগের আহ্বানের কথা কি মানুষ ভুলে গেছে? ১৩ জানুয়ারি ট্রাম্প ইরানিদের বলেছিলেন, ‘প্রতিবাদ চালিয়ে যান…সাহায্য আসছে।’ কিন্তু কোনো সাহায্য আসেনি। বরং ধারণা করা হয়, সেই সময় হাজার হাজার প্রতিবাদকারী নিহত হয়েছিল। এখন আবার তিনি জনগণকে বলছেন, ‘সরকার দখল করে নাও।’ কিন্তু সহায়তা আসে না, তার বদলে আসে বোমা।

নেতানিয়াহুর বক্তব্য, পাহলভির আহ্বান এবং ট্রাম্পের ডাক, সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ, এতে শাসকগোষ্ঠী সহজেই রাস্তায় নামা মানুষদের ‘বিদেশি শক্তির দালাল’ বলে দাগিয়ে দিতে পারে। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ ধরনের অভিযোগ তুলে বহু কর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহতদের পাশাপাশি ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে শত শত শিশুও রয়েছে।

এমন দেশে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সেখানে সাধারণ মানুষের কাছে এই ধরনের আহ্বান করা অত্যন্ত বেপরোয়া এবং বিপজ্জনক। আমার মনে হয়, বহু শক্তিই ইরানের জনগণের প্রকৃত গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্যকে ভয় পায়। শুধু ইরানি শাসনব্যবস্থাই নয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন। কারণ, ইরানি জনগণ নিজেরাই ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে পারে। কারণ সাধারণ মানুষের নেতৃত্বে কোনো আন্দোলন হলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাই এই ‘শাসন পরিবর্তন’ যেন ‘ওপর’ থেকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ‘নিচ’ থেকে উঠে আসতে দেওয়া হচ্ছে না।

যারা বলছে এই যুদ্ধ ইরানকে মুক্ত করার জন্য নয়, কিংবা গুলি ও বোমা দিয়ে রুটি ও স্বাধীনতা আনা যায় না—রাজতন্ত্রপন্থিরা তাদের আক্রমণ করছে। তারা বলছে, ‘হয় তুমি আমাদের সঙ্গে, নয়তো ইসলামি শাসনের সঙ্গে’। তাদের কাছে রাজনীতিটা এমনই। কারণ, তারা কখনো রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্রিয় ছিল না, তারা কারাগার বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও জানে না।

শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় আসার পর আমার প্রজন্ম তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমাদের দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, আর অনেক রাজতন্ত্রপন্থি তখন দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আজ তারা আবার সেই মানুষদেরই আক্রমণ করছে যারা বিদেশি আগ্রাসন ও বেসামরিক হত্যার বিরোধিতা করছে। তাদের কিছু স্লোগান আমি শুনেছি। তারা বলে—‘মোল্লা, বামপন্থি ও মুজাহেদিনদের মৃত্যু’। ভাবা যায়, যে মানুষগুলোকে এতদিন শাসকগোষ্ঠী ফাঁসি দিয়েছে, এখন রাজতন্ত্রপন্থিরাও তাদেরই ফাঁসির দাবি তুলছে!

এখন যখন এত শক্তি একত্র হয়ে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তখন বিশ্বের মানুষের উচিত একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আকাশ থেকে নেমে আসা এই বেসামরিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। আমি আশা করি, পশ্চিমের মানুষ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে এবং এর অবসান দাবি করবে।

লেখক: নারী অধিকারকর্মী ও ইরানি লেখক

গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘হু উইল স্ট্যান্ড আপ ফর দ্য ইরানিয়ান পিপল অ্যাজ ডেথ রেইনস অন দেম ফ্রম দ্য স্কাইজ?’ শীর্ষক কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন। 

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]