মমতা-অভিষেকের কার্যালয়ে সিআইডির অভিযান

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনসংক্রান্ত চিঠিতে বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এবার নজিরবিহীন অভিযানের সাক্ষী হলো রাজ্যের রাজনীতিক মহল।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের দলীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে রাজ্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইডি)। একই সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসেও ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়।
স্বাক্ষর জালিয়াতিকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভেতরে তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে নতুন তৃণমূল তৈরি হয়েছে। এমন রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার সিআইডির অভিযান নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ৩টা ১৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত তৃণমূলের সেন্ট্রাল পার্টি অফিসে পৌঁছান সিআইডির কর্মকর্তারা।
এর আগে এ ঘটনার বিসয়ে সিআইডির নোটিশের জবাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই কার্যালয় থেকে বিধায়কদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ তথ্য ও আদালতের সার্চ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সিআইডির একটি বিশেষ টিম কার্যালয়টি ঘিরে ফেলে। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় কালীঘাট ও ভবানীপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। তল্লাশির মূল উদ্দেশ্য ছিল কার্যালয়ের লগবুকটি খুঁজে বের করা।
তবে অভিযানের শুরুতে তীব্র বাধার মুখে পড়েন গোয়েন্দারা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন সাবেক সাংসদ, তৃণমূল নেতা ও আইনজীবী শুভাশিস চক্রবর্তী। নিজেকে দলের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে তল্লাশি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে, সিআইডি কর্মকর্তারা তাদের আইনি অধিকার ও প্রয়োজনীয় নথির কথা উল্লেখ করে জানান, তদন্তে বাধা দেওয়া আইনত অপরাধ। অবশেষে দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে সিআইডি টিম। রাত ৯টার দিকে দুই অফিসে তল্লাশি শেষ হয়।
অভিযানের খবর শুনে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুনাল ঘোষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তবে তাদের কাউকে কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
একইভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসেও বাধার মুখে পড়েন সিআইডি অফিসাররা। সেখানে অফিসের কর্মীরা তদন্তকারীদের অসহযোগিতা করেন এবং বিভিন্ন কক্ষের দরজা আটকে দেওয়া হয়। পরে গোয়েন্দারা সমস্ত বাধা সরিয়ে অফিসের ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হন।
সিআইডির শেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় অভিষেকের হাজিরা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। এর আগে এই অভিযান শুরু হয়।
স্বাক্ষর জালিয়াতিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটেছিল লোকসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর। গত ৬ মে বিধায়কদের নিয়ে কালীঘাটে বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যেখানে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। ওই সময় উপস্থিত সকলে হাত তুলে তা সমর্থন করেন। কিন্তু বিধানসভায় নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়নি। এরপর ১৩ ও ১৪ মে বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণের পর নিয়ম মেনে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে বিরোধী দলনেতার নাম চূড়ান্ত করার প্রস্তাবপত্রের জন্য ১৯ মে আবার কালীঘাটে বিধায়কদের বৈঠক ডাকা হয়। ওইদিন অনেক বিধায়ক গরহাজির থাকলেও দলের তরফে ৭০ জনের স্বাক্ষর করা একটি কাগজ বিধানসভার সচিবের কাছে জমা দিয়ে সেটিকে বিরোধী দলনেতার প্রস্তাবনাপত্র দাবি করা হয়।
কিন্তু দুই জায়গায় করা তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষরের মধ্যে মিল না থাকায় বিধানসভার সচিবের মনে জালিয়াতির সন্দেহ জাগে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত থানায় গড়ালে এফআইআর দায়ের করা হয় এবং তদন্তের ভার পায় সিআইডি। ইতোমধ্যে একাধিক বিধায়ককে জেরা করা হলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন অজুহাতে তিনবার সিআইডির তলব এড়িয়ে যান। এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সরাসরি তৃণমূলের শীর্ষ দুই কার্যালয়ে এই সাঁড়াশি অভিযান চালাল সিআইডি।
