logo

উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা নিয়ে ইরানিদের সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রতিবেশীদের কী বার্তা দিচ্ছে

উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা নিয়ে ইরানিদের সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রতিবেশীদের কী বার্তা দিচ্ছে

ইরানে মার্কিন ও ইস্রায়েলি সামরিক অভিযানের পর তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হওয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি নমনীয় বার্তা দেয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি ইরানি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

গত শনিবার (৭ মার্চ) প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের প্রতি ‘অসন্তোষ’ জানিয়ে বার্তা দিয়েছে আইআরজিসি। সঙ্গে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রায়েল তাদের এলাকা ব্যবহার করে ইরানকে আঘাত করে, তাহলে তেহরান হামলা অব্যাহত রাখবে।’

একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ‘ইরান হামলা বন্ধ করতে যাচ্ছে না।’ পাশাপাশি তেহরানের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ।

অর্থাৎ, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার ব্যাপারে ইরানের কর্তৃস্থানীয় মহল থেকে ভিন্ন ভিন্ন, এবং সাংঘর্ষিক বার্তা দেয়া হয়েছে। 

এরই মধ্যে গত শনি ও রোববার উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলা অব্যাহগত থাকার খবর এসেছে গণমাধ্যমে। শনিবার কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যে তারা হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানের নেতারা কী বলেছেন?
শনিবারের একটি রেকর্ড করা বার্তায় পেজেশকিয়ান ঘোষণা করেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা তখনই বন্ধ করা হবে যদি তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানের দিকে কোনো আঘাত না আসে। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি, যারা ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। আমাদের কমান্ডার, নেতা ও প্রিয়জন এই নির্মম আগ্রাসনের ফলে প্রাণ হারিয়েছে এবং আমাদের সেনারা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন।’

তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রতিবেশী দেশের সীমানা লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে এসব হামলা করিনি। আমি বহুবার বলেছি, তারা আমাদের ভাই। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রিয়জনদের পাশে আছি।’
তবে পেজেশকিয়ানের এই বার্তার কিছু সময় পর আইআরজিসি ঘোষণা করে, ইরানের সেনারা প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং এ পর্যন্ত তাদের ওপর কোনো আগ্রাসন চালায়নি। কিন্তু তারা সতর্ক করেছে, ‘যদি শত্রুতা অব্যাহত থাকে, তাহলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সকল সামরিক ঘাঁটি, স্থাপনা ও স্বার্থকে লক্ষ্য করা হবে এবং তারা ইরানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর আঘাতের মুখোমুখি হবে।’

পরে পেজেশকিয়ানও তার বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরান প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রতিবেশী দেশকে আঘাত করেনি, বরং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসমূহকে লক্ষ্য করেছে।’
আইআরজিসি ও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন শত্রুরা আমাদের আঘাত করে, আমরা প্রতিক্রিয়া জানাই এবং আমরা তা চালিয়ে যাব। এটা আমাদের অধিকার এবং স্থায়ী নীতি। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে বাধা দিতে হবে, নাহলে আমাদের নিজেদেরই ব্যবস্থা নিতে হবে।’

পরে রোববার সকালে পেজেশকিয়ান বলেছেন, শত্রুরা প্রতিবেশীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য তার মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তিনি বলেছেন, ‘ইরান ভাইসুলভ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়, কিন্তু অন্য দেশ থেকে হামলা আসায় প্রতিক্রিয়া জানানো অপরিহার্য ছিল। তবে এর মানে এই নয় যে, ওই দেশগুলোর সঙ্গে কোনো বিরোধ রয়েছে।’

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার ওপর ইরানের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি শত্রুতা বা বৈরিতা হিসেবে ধরা উচিত নয়।’

দোহায় মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খালিদ আল-জাবের আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘ইরানের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরোধপূর্ণ বার্তা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পৌঁছেছে। আমরা জানি না কোনটি সত্য। তবে যুদ্ধের মধ্যে ইরান উপসাগরের কিছু অবকাঠামোতে আক্রমণ বন্ধ করবে বলে মনে হয় না।’

ইরানের বার্তা কীভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত?
আলজাজিরার রেসুল সেরদার বলেছেন, ‘পেজেশকিয়ানের দুঃখ প্রকাশ আইআরজিসির কাছে ভালো লাগেনি। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়ী। বিদেশ ও নিরাপত্তা নীতির মতো কৌশলগত বিষয় নিয়ে তাদের কথায় কিছু যায় আসে না। এসব বিষয়ে মূল ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতা ও আইআরজিসির হাতে।’

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেছেন, ‘পেজেশকিয়ানের মাঝে মাঝে বিতর্কিত মন্তব্য তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেন। তবে যুদ্ধের মধ্যে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হলো আইআরজিসি।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
ক্ষমাপ্রার্থনা ও হুমকির পরও উপসাগরীয় দেশগুলিতে হামলা অব্যাহত রয়েছে। রোববার ইরানি ড্রোন হামলায় বাহরাইনের একটি পানি পরিশোধনাগারে ক্ষতি হয়েছে। তার আগে শনিবার কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের এলাকায় মিসাইল ও ড্রোন পড়েছে। কুয়েত দুই পুলিশ কর্মীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে এবং হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সামাজিক নিরাপত্তা অফিসে আগুন লাগার কথা জানিয়েছে।

এছাড়া রিয়াদের কূটনৈতিক অঞ্চলে হামলা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের আকাশসীমায় কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। 
উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি) বলেছে, ‘ইরানের বাহরাইন ও কুয়েতের ওপর হামলা জঙ্গি আগ্রাসনের কাজ এবং এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।’

মার্কিন প্রতিক্রিয়া
শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্টের দুঃখ প্রকাশের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ইরান আর মধ্যপ্রাচ্যের আওয়াজ হিসেবে নেই, তারা এখন পরাজিত শক্তি। তারা দশক দশক ধরে এ অবস্থায় পড়ে থাকবে, যতক্ষণ তারা আত্মসমর্পণ করবে বা ভেঙে পড়বে।’

লেখক: লেখক ও সাংবাদিক

আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘হোয়াই আর ইরানিয়ান লিডার্স সেন্ডিং মিক্সড মেসেজেস অন গালফ অ্যাট্যাকস?’ শীর্ষক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।