logo

আইআরজিসির ছায়ায় আবারও যেভাবে শক্তিশালী হলো হিজবুল্লাহ

আইআরজিসির ছায়ায় আবারও যেভাবে শক্তিশালী হলো হিজবুল্লাহ

২০২৪ সালে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছিল লেবাবনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সে বছর সেপ্টেম্বরে হিজবুল্লাহর প্রধান নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা ও ভয়াবহ পেজার হামলা চালিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনেকটা শক্তিহীন করে ফেলেছিল ইসরায়েল। এর ধারাবাহিকতায় সে বছর নভেম্বরে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয় হিজবুল্লাহ। যদিও ইসরায়েলই বারবার সে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে। কিন্তু বিপরীতে হিজবুল্লাহ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।

ওই হামলায় হাসান নাসরাল্লাহসহ প্রায় সব শীর্ষ কমান্ডারকে হারিয়ে যখন হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব সংকটে ছিল, তখন পর্দার আড়াল থেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের জালে বিদ্ধ হিজবুল্লাহর পুরোনো কমান্ড কাঠামো ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন এক সামরিক বিন্যাস তৈরি করেছে ইরান। ইরানে চলমান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রয়টার্স ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্যমতে, নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর হিজবুল্লাহর কমান্ডে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে ইরান সরাসরি তাদের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৮২ সালে হিজবুল্লাহর জন্মের পর এই প্রথম তেহরান এতটা সরাসরি এবং বড় পরিসরে গোষ্ঠীটির সামরিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা কেবল হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের নতুন করে প্রশিক্ষণই দেননি, বরং তাদের অস্ত্রাগারকেও আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত করেছেন।

ইসরায়েলি গোয়েন্দারা হিজবুল্লাহর কমান্ড স্তরে যে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল, তার কারণেই একের পর এক শীর্ষ নেতাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। আইআরজিসির বিশেষ টিম এই পুরো যোগাযোগ ও কমান্ড কাঠামোকে নতুন করে সাজিয়েছে, যাতে পুনরায় তথ্য পাচারের ঘটনা না ঘটে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও হিজবুল্লাহ এখনও এক ভয়ংকর ও প্রাসঙ্গিক সামরিক শক্তি নিয়ে লড়ছে বলে স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হয়। প্রথম দুই দিন হিজবুল্লাহ নীরব থাকলেও ২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যুক্ত হয়। এর পর থেকে হিজবুল্লাহ শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনীর সাথে সরাসরি রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের। লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হলেও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধের মাত্রা কমেনি। বরং বেড়েছে।

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শনিবার (২১ মার্চ) লেবাননের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় কুরা এলাকায় সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা। এ সময় লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর এক দিনে রেকর্ড সংখ্যক ৫৫টি পৃথক হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। একসঙ্গে এত সংখ্যক হামলা এর আগে হিজবুল্লাহ চালায়নি।

হিজবুল্লাহর শক্তি কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন কম হলেও, ইসরায়েলের পূর্ণমাত্রার আক্রমণের মুখে তারা কতটুকু টিকতে পারবে তা দেখার বিষয়। হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে বার্তা সংস্তা রয়টার্সকে তৎক্ষণাৎ কোনো সাড়া দেয়নি। 

যিদিও ইসরায়েলের প্রথানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন, হিজবুল্লাহ ইরানের সমর্থনে পুনরায় সশস্ত্র হওয়ার এবং তাদের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে।

হিজবুল্লাহর নতুন যুদ্ধকৌশল

দীর্ঘদিনের চেনা কাঠামো ভেঙে হিজবুল্লাহকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও দুর্ভেদ্য সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে আইআরজিসি। ২০২৪ সালের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের নজরদারি এড়াতে হিজবুল্লাহ এখন তাদের পুরোনো ‘স্তরভিত্তিক’ বা হায়ারার্কিক্যাল কমান্ড সিস্টেম পুরোপুরি বাতিল করেছে।

সূত্রমতে, ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পরপরই প্রায় ১০০ জন আইআরজিসি কর্মকর্তা লেবাননে পৌঁছান। ইসরায়েলি বিমান হামলা চলকালীন তারা হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। মূলত গত বছর থেকেই ইরানি বিশেষ উপদেষ্টারা হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ডের সরাসরি তদারকি শুরু করেছিলেন।

নতুন এই পরিবর্তনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘বিকেন্দ্রীকরণ’। আগে হিজবুল্লাহর একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড ছিল, যা ইসরায়েলের জন্য লক্ষ্যবস্তু করা সহজ ছিল। এখন ছোট ছোট অনেকগুলো স্বাধীন ইউনিট বা ‘সেল’ গঠন করা হয়েছে। 

উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এক ইউনিটের যোদ্ধারা অন্য ইউনিটের পরিকল্পনা বা অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর ফলে কোনো একটি ইউনিট ধরা পড়লেও পুরো সংগঠনের গোপনীয়তা ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকছে না।

কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এই নতুন কাঠামোকে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ১৯৮০-র দশকে হিজবুল্লাহ ঠিক এভাবেই ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে লড়াই করত। এই কৌশলের সুফল গত ১১ মার্চ দেখা গেছে, যখন ইরান এবং লেবানন থেকে একযোগে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি চালানো হয়।

লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, আইআরজিসি এখন কেবল হিজবুল্লাহকে অস্ত্রই দিচ্ছে না, বরং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিও নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও প্রতিটি ছোট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের কাজ স্থানীয় যোদ্ধারা করছেন, কিন্তু যুদ্ধের সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে দিচ্ছে তেহরান। ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তির এক বিশেষ ‘অডিট’ বা নিরীক্ষা চালানোর পরই ইরান এই বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, নাসরাল্লাহ-পরবর্তী হিজবুল্লাহ এখন অনেক বেশি ছদ্মবেশী এবং কার্যকর হয়ে উঠেছে। এই নতুন ‘ফ্ল্যাট সিস্টেম’ বা সমতল কাঠামোর কারণে ইসরায়েলের পক্ষে হিজবুল্লাহর মূল শক্তিকে আঘাত করা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।

লেবানন সরকারের কঠিন সিদ্ধান্ত

লেবানন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত লেবাননি সেনাবাহিনী দীর্ঘ দিন ধরে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার একটি প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে আইআরজিসির সক্রিয় পুনর্গঠন কাজ এই প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

লেবানন সরকারের বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জন ইরানি নাগরিক দেশটিতে অবস্থান করছেন। তাদের মূল কাজ কূটনৈতিক নয় বরং আইআরজিসির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। এই প্রেক্ষাপটেই মার্চ মাসের শুরুতে তাদের লেবানন ছাড়ার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ১৫ মাসে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় যে ৫০০ জন নিহত হয়েছেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল আইআরজিসি সদস্য। চলমান নতুন যুদ্ধ শুরুর পর ৮ মার্চ বৈরুতের একটি হোটেলে হামলার ঘটনাতেও আইআরজিসির বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

১৯৮২ সালে বেকা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর জন্মলগ্ন থেকেই আইআরজিসি তাদের ছায়ার মতো আগলে রেখেছে। প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলেইমানি থেকে শুরু করে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ—সবার সাথেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন ইরানি জেনারেলরা।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা