logo
Advertisement
মুডি’সের প্রতিবেদন

হরমুজ প্রণালি আগের মতো সচল না হলে কী হবে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হরমুজ প্রণালি আগের মতো সচল না হলে কী হবে
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের তেল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে এই প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে ইরান। এতে সারা বিশ্বে তেল সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।

Advertisement

পরিস্থিতি বিবেচনায় হরমুজে চলমান নৌ-অস্থিতিশীলতা সহজে কাটছে না। এতদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজারগুলো এই পরিস্থিতিকে সাময়িক সংকট হিসেবে দেখে আসছিল। তাদের ধারণা ছিল, কূটনীতি অথবা সামরিক উত্তেজনা কমার মাধ্যমে এই জলপথের অচলাবস্থা কেটে যাবে। কিন্তু বৈশ্বিক রেটিং সংস্থা মুডি’স রেটিংস এখন পুরো বিশ্বকে এই বিষয়ে ভিন্নভাবে ভাবার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে।

এ সংক্রান্ত নতুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মুডি’স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জ্বালানি সরবরাহ পথের সমস্যা এখন আর স্বল্পমেয়াদী কোনো ধাক্কা নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, ২০২৬ সালের পরেও এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

আগের মূল্যায়নগুলোতে এই সংকটকে সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি মনে করা হলেও, মুডি’সের বর্তমান সতর্কবার্তা পরিস্থিতি কতটা জটিল তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এই ধারণা মাথায় রেখেই এখন পরিস্থিতি বিবেচনা করা হচ্ছে।

এখনও বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালি পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধানতম একটি পথ। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের চেয়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।

সামুদ্রিক মাইনের আতঙ্ক এবং নৌ চলাচলে নানামুখী বিঘ্ন ঘটার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো এই এলাকা এড়িয়ে চলছে। পাশাপাশি বীমা কোম্পানিগুলোও তাদের প্রিমিয়ামের খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

মুডি’সের মতে, সংঘাতের খবরগুলো সংবাদে প্রধান শিরোনাম হলেও, আসল চিন্তার বিষয় হলো এই অচলাবস্থা মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকা। এর ফলে জাহাজ ভাড়া বা পরিবহন খরচ স্থায়ীভাবে বেড়ে যেতে পারে, জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি ধীর হয়ে পড়তে পারে। পারস্য উপসাগরের এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের সরবরাহ ব্যবস্থার কৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে।

ইতোমধ্যে বৈশ্বিক শিপিং রুটগুলোর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বিশ্বের দেশগুলো এখন পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ, ভিন্ন পাইপলাইন রুট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

উচ্চ তেলের দাম কি এখন সাধারণ বিষয়?

মুডি’স আশা প্রকাশ করে বলেছে, অপরিশোধিত তেলের দাম এই বছরের বেশির ভাগ সময় প্রতি ব্যারেলে ৯০ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে থাকবে। এই দাম আগের পূর্বাভাসের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ভোক্তা পর্যায়ে এ পরিস্থিতির অর্থ হলো জ্বালানির দাম, বিমান ভাড়া, পরিবহন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ। মুডি’স বলেছে, উচ্চ জ্বালানির দামের কারণে উচ্চ পর্য়ায়ে মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে, যুদ্ধবিরতি হলেও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে সময় লাগবে। কারণ শিপিংয়ের ব্যাকলগ বা জটলা, ট্যাংকার পুনঃস্থাপন এবং বীমা ব্যবস্থা স্থিতিশীল হতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।

প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এই সংকটের কারণে তৈরি হওয়া কিছু পরিবর্তন হয়ত আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার নকশা, ঝুঁকির প্রিমিয়াম এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভবত স্থায়ী হবে বলে ধারণা মুডি’সের।

বিমান সংস্থা ও উৎপাদন খাতের ঝুঁকি

তেলের দাম এভাবে চড়া থাকলে শিল্প জ্বালানি ও পরিবহনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।

উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং গ্রাহকদের ওপর বর্ধিত খরচ চাপানোর সীমিত ক্ষমতার কারণে এয়ারলাইনস, রাসায়নিক এবং নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোকে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখোমুখি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডি’স। একই সময়ে, কিছু খাত এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে লাভবানও হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ পরিবারগুলো যদি খরচ কমিয়ে দেয়, তবে খুচরা বিক্রেতা, আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) এবং উৎপাদন খাতসহ ভোক্তা খাতগুলোও চাপের মধ্যে পড়তে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের জ্বালানি উৎপাদক এবং মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা (অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স) কোম্পানিগুলো উচ্চ তেলের দাম এবং বর্ধিত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এশিয়া

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এশিয়ার অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে মধ্যে রয়েছে। এরমধ্যে ভারতকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৬ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

এছাড়া জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া বড় ধরনের জরুরি মজুত রাখা সত্ত্বেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত মূল্য নির্ধারণ এবং বিশাল মজুত থাকা সত্ত্বেও চীন শিল্প খাতের মুনাফায় চাপের মুখোমুখি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

মুডি’স বলেছে, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ৯০–১১০ ডলারে বজায় থাকলে বেশ কয়েকটি প্রধান অর্থনীতির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২–০.৮ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বকে হয়তো এই সংকটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে

মুডি’সের প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় বার্তাটি হলো, বৈশ্বিক অর্থনীতি হয়তো এখন আর হরমুজ প্রণালি সংকটের দ্রুত অবসানের জন্য অপেক্ষা করছে না। এর পরিবর্তে সরকার, ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে এমন একটি সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন— বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য পথের অচলাবস্থা, বাড়তি খরচ এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতির এক নিয়মিত ও অলিখিত অংশ হতে চলেছে।

সূত্র: গালফ নিউজ