মমতার যোগদানের জল্পনা ভিত্তিহীন: কংগ্রেস

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগদানের জল্পনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। মমতার সাম্প্রতিক দিল্লি সফর ও সেই সফরে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং এরপর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধীর বৈঠক হয়। এ খবরে দেশজুড়ে জল্পনা জোরদার হয় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনর্বাসন দিতে পারে জাতীয় কংগ্রেস।
জাতীয় স্তরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, অবশিষ্ট দল কংগ্রেসের মিশিয়ে দেওয়ার শর্তে মমতাকে পুনর্বাসন চায় কংগ্রেস। মমতাকে সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের জাতীয় সহসভাপতি এবং অভিষেককে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। আরও দাবি করা হয় মমতার শর্ত মেনে তাকে সংসদীয় রাজনীতিতে ফেরাতে সাংসদ হিসেবে মমতাকে রাজ্যসভায় পাঠাবে কংগ্রেস।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল জানিয়েছেন, সব জল্পনা ভিত্তিহীন। বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে জাতীয় স্তরের ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দলের একসঙ্গে হওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
দিল্লির ইন্দিরা ভবনে এদিন কংগ্রেসের সব প্রদেশের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে বৈঠক করেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। দেশে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, নিট কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ দিনের বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসসংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন বেণুগোপাল।
সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একটি খবর দেখানো হয়েছে। এই খবর সম্পূর্ণ ভুয়া। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৪০ বছরের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তাদের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। যা আপনারা বলছেন, সেই সব বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
তবে এ বিষয়ে অবগত দিল্লির বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে, প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের তীব্র বিরোধিতার মুখে মমতাকে নিয়ে কংগ্রেস হাইকমান্ড পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের যেটুকু অস্তিত্ব আছে সেটুকুও বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় মমতাকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সোনিয়া কিংবা রাহুল।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন মমতা। এরপর কংগ্রেসকে ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করেছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর পরিষদীয় দল হাতছাড়া হয় মমতার। চলতি সপ্তাহজুড়ে পশ্চিমবঙ্গে যখন তার দলের নেতারা একে একে সঙ্গ ছাড়ছিলেন, একের পর এক কাউন্সিলর-নেতারা গ্রেপ্তার হচ্ছিলেন, তখন মমতা দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে ছিলেন। মমতা দিল্লিতে থাকাকালীন সংসদীয় দলও হাতছাড়া হয় মমতার। রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমত কোণঠাসা মমতা এমন অবস্থায় দেখা করেন সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে। এরপর তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের একাধিক সূত্রে মমতার কংগ্রেসে যোগদানের জল্পনার জোরদার হয়।
ইঙ্গিত জোরাল হয় শিবসেনা (উদ্ধবপন্থি) সাংসদ সঞ্জয় রাউতের একটি বক্তব্যে। তিনি ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, টিএমসি, এনসিপি, এবং কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা অন্য দলগুলোর উচিত আবার মূল দলে ফিরে যাওয়া।
তার দাবি, শক্তিশালী কংগ্রেস বিরোধী রাজনীতিকে নেতৃত্ব দিতে পারবে এবং বিজেপি দেশের ছোট আঞ্চলিক দলগুলিকে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চাইছে।
এ অবস্থায় মাত্র ১২ ঘণ্টার নোটিশ বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে জরুরিভিত্তিতে বৈঠক বসেছিল কংগ্রেস। দেশের সব রাজ্যের প্রদেশ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে দিল্লির ইন্দিরা ভবনে বৈঠকে ডেকেছিল কংগ্রেস। দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত নোটিশের এই বৈঠক ঘিরেও ব্যাপক জল্পনা দানা বাদে।
যদিও কংগ্রেস হাইকমান্ড ও মমতার এমন ঘনিষ্ঠতায় পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের অভ্যন্তরে দেখা দেয় তীব্র অসন্তোষ। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী থেকে কংগ্রেস নেতা মোহিত সেনগুপ্ত, আব্দুল মান্নান, শুভঙ্কর ভট্টাচার্য প্রত্যেকেই হাইকমান্ডের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন।
মোহিত সেনগুপ্তও মমতার দলে ফের নিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমরা তীব্র বিরোধিতা করছি। আমরা কোনোমতে মেনে নেব না। আমরা চাই ওই জঞ্জাল আর যেন কংগ্রেসে না আসে। এইসব মানুষ যদি কংগ্রেসে আসে, গ্রামবাংলার মানুষ আর কংগ্রেস করবে না।’
কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান মমতা ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেসকে রীতিমতো নর্দমার নোংরা জলের সঙ্গে তুলনা করেন। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের এমন অনমনীয় প্রতিরোধের মুখে মমতা ইস্যু বৈঠকে বেশি দূর এগোয়নি।
তবে বৃহস্পতিবার কংগ্রেস হাইকমান্ডের বৈঠকে ঠিক হয়েছে, আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে দেশজুড়ে কংগ্রেস আন্দোলনে নামছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবক্ষয়, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামবৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। কয়েক দিনের মধ্যে এই কর্মসূচির নাম, সময়সূচি জানিয়ে দেওয়া হবে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে।
