আবারও কি শান্তি চুক্তি আলোচনায় বসতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

উত্তেজনা নিরসনে প্রায় চার দশক পর প্রথমবারের মতো সরাসরি মুখোমুখি সংলাপে বসেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত সেই ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা ঐতিহাসিক হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার মূল কারণ উভয় পক্ষের নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকা।
ইরান বেশ কয়েকটি বিষয়কে ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অধিকার, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এই অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একটি মূল দাবিতে অনড় রয়েছে। তারা ইরানকে যে কোনো ধরনের পারমাণবিক মজুত রাখার অধিকার সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হবে। এই বিষয়ে তেহরান সম্মত না হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা সম্ভব হয়নি।
এতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কি এখানেই শেষ হয়ে গেল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কারণে বিশ্ব যে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছিল, পুনরায় কি সেদিকেই এগোবে? আবারও কি শান্তি চুক্তি আলোচনায় বসতে পারে উভয় পক্ষ?
সাংবাদিকদের করা এমন একটি প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএকে তিনি বলেন, ‘কূটনীতি কখনো শেষ হয় না। কূটনৈতিক ব্যবস্থা হলো জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত ও সংরক্ষণ করার একটি হাতিয়ার। ইরান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, বন্ধু ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখবে।’
ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে’। কিন্তু ‘দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য’ রয়েছে। ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা হয়েছিল অবিশ্বাস ও সন্দেহের আবহে। এটা স্বাভাবিক যে, আমরা শুরু থেকেই এক বৈঠকেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করিনি। কেউই তেমনটা আশা করেনি।
যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন, শান্তি আলোচনার সাফল্য নির্ভর করছে ‘বিপক্ষ দলের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা’ এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ওপর।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফারস সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের বর্তমানে ‘পরবর্তী দফা আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কোনো তাড়া নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি যুক্তিসঙ্গত চুক্তিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির স্থিতিতেও কোনো পরিবর্তন হবে না।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরানের সঙ্গে রাতভর আলোচনার ফাঁকে ‘ধারাবাহিকভাবে’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল যোগাযোগ রেখেছে। গত ২১ ঘণ্টায় এই সংখ্যা ছয় থেকে ১২ বার। পাশাপাশি সেন্টকমের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট ও জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বেশ কয়ে দফায় ইরানের ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা সদিচ্ছা নিয়েই আলোচনা করছিলাম...। আমরা ইরানকে আমাদের সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত প্রস্তাব দিয়েছি। এখন দেখার বিষয় তারা সেটা গ্রহণ করে কি না।
মূলত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তেহরান কোনো ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে পারবে না। ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিও করতে পারবে না তারা। তাছাড়া সংর্কীণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার জন্যও একতরফা দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরান জানায়, পারমাণবিক কর্মসূচির ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান থেকে তারা একচুলও সরে আসবে না। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে টোল পদ্ধতির বিষয়েও তারা অনড়।
এদিকে ইসলামাবাদ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখারা ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, আগামী দিনগুলোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পৃক্ততা ও সংলাপ সহজতর করতে পাকিস্তান তার ভূমিকা পালন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের থায়ার মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোশ বলেছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার সময় ওয়াশিংটন ইরানের কাছে তার অবস্থান স্পষ্ট করলেও, নিজেদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনেনি। ইরানিরা সম্ভবত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের চেয়ে ভ্যান্সকে আরও নমনীয় আলোচক হিসেবে পেতে আশাবাদী ছিল। কিন্তু ইসলামাবাদে তারা ভিন্ন চিত্র দেখতে পেয়েছে।
এই বিশ্লেষক মনে করেন, এই সংলাপে তারা স্পষ্ট বার্তা পেয়েছেন যে, আমেরিকা নিজের অবস্থানে মিত্রের (ইসরায়েল) স্বার্থকেও বেশ গুরুত্ব দিয়েছে; এ ব্যাপারে তারা একাট্টা। তবে পরিস্থিতি কী ও আপনি কার সঙ্গে বৈঠক করছেন, তা জানাটাই সংলাপের মূল চাবিকাঠি। তাই আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু হবে।
সূত্র: আলজাজিরা, গার্ডিয়ান, সিএনএন