পাকিস্তানে তেল ও ভারতে গ্যাস সংকট চরমে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতার মুখোমুখি হয়েছে পাকিস্তান ও ভারত। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এই দুই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের খুচরা বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ভারতে গ্যাসের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, এই সংকট দেশ দুটির অর্থনীতির পাশাপাশি প্রভাবিত করছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকেও।
ইকোনমিক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান নিজেদের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করে থাকে। জুলাই ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশটির তেল আমদানি ১০ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, এবং ২০২৪ সালে দেশটির তেল আমদনি ছিল ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এবার ইরানে যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আমদানিও বিঘ্নিত হচ্ছে পাকিস্তানের। জ্বালানি তেলের এই সংকট মোকাবিলায় দেশজুড়ে সরকারিভাবে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ রাখারও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জনিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারিদের বাসা থেকে অফিস করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও একই ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ থাকলেও নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের ফলে উদ্ভুত অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ফেডারেল ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্যরা আগামী দুই মাসে বেতন ও ভাতা নেবেন না। এ ছাড়া আইনপ্রণেতাদের বেতনও কমিয়ে দেওয়া হবে ২৫ শতাংশ। সকল সরকারি বৈঠক অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথির সংখ্যা কমিয়ে আনতে বলা হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক আমের জাফর দূররানি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারিভাবে নেওয়া এসব পদক্ষেপ অল্প সময়ের জন্য কার্যকর হতে পারে, কিন্তু তেলের চাহিদা কমাতে পারবে না।’
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে তিনি পরিবহন চাহিদার জন্য বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পে ডিজেল নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলএনজি খাতেও চাপে রয়েছে পাকিস্তান। ২০১৫ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করছে দেশটি। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই এলনজি ব্যবহার করে তারা।
এদিকে বিশ্বব্যাপী তেলের দামে উল্লম্ফনের মধ্যেও ভারতে এর মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়পত্রের পর রাশিয়া থেকে ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনেছে ভারত, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের ঘাটতি মেটানোর একটি পদক্ষেপ। ভারতের রিফাইনাররা যেমন ইন্ডিয়ান অয়েল কর্প ও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সব বাকি থাকা রাশিয়ান ক্রুড তেল কিনেছে।
তবে ইরান যুদ্ধে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় গ্যাস সংকটে পড়েছে দেশটি। এমনকি রান্না কাজে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে তারা। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহকে গৃহস্থালি, পরিবহন ও এলপিজি উৎপাদনের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, এবং সার, চা উৎপাদনের মতো অন্যান্য খাত তাদের চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস পাবে। তবে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোর কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
মুম্বাই, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরু শহরে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। মুম্বাইয়ের হোটেল মালিক সংগঠনের দাবি, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শহরের ৫০ শতাংশ হোটেল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ভারতের গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে, এবং এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ৩১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে মাত্র ১২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, বাকিটা আমদানি করা।

