logo

জেন-জি ভোটারদের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ

জেন-জি ভোটারদের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো কার্যত কোণঠাসা ছিল। কখনো তারা নির্বাচন বর্জন করেছে, কখনো আবার শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতেই পারেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনেকেই ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসেবে দেখছেন।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের বিষয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা তরুণদের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই কারণেই একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য ভালো ফলের কথা বলছেন অনেকেই।

ঢাকাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের এক জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় দুর্নীতি। এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কিছু ভোটারের আগ্রহের প্রধান কারণ তাদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। ধর্মীয় অবস্থানের চেয়ে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানই তাদের পক্ষে কাজ করছে বেশি।

জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়ের চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা দক্ষ, যত্নশীল এবং জবাবদিহিমূলক।

প্রথমবারের ভোটার ২১ বছর বয়সি মোহাম্মদ রাকিব জানান, তিনি চান এমন একটি সরকার আসুক, যারা মানুষকে স্বাধীনভাবে কথা বলার এবং ভোট দেওয়ার সুযোগ দেবে। 

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারেনি। কথা বলার সুযোগও ছিল না। যেই সরকারই আসুক, আমি চাই তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করুক।

বিশ্লেকদের মতে, ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার দেশের স্থিতিশীলতা ফেরাতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে চূড়ান্ত ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবার মোট ভোটারের এক-চর্তুথাংশ জেন-জি, তারা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকার সেন্টার ফর গর্ভনেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, জনমত জরিপগুলো ভোটে বিএনপির এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করছে। তবে মনে রাখতে হবে, ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন। ফলাফলকে বেশ কিছু বিষয় প্রভাবিত করবে। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জেন-জি ভোটার আছে। তারা কাকে ভোট দেবে; কারণ তাদের পছন্দ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করবে। 

এদিকে, শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রভাব পড়েছে।  এমন অবস্থায় আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল ভারত ও চীনের ভূমিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, শেখ হাসিনাকে ভারতঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ায় অনেকের মতে, বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কমছে এবং চীনের প্রভাব বাড়ছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতের তুলনায় বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারে। তাদের মতে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

রয়টার্স সরাসরি নাম উল্লেখ না করেই প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জামায়াতের জেন-জি মিত্র বলছে, বাংলাদেশে ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি জেন-জি নেতারা ঢাকায় চীনের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, তারা কোনো দেশের প্রতি ঝুঁকে নেই।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানান, তার দল ক্ষমতায় এলে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘যে কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ বজায় রাখবে। জনগণ ও বাংলাদেশের জন্য যা ভালো হবে, সেই ভিত্তিতেই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা হবে।