জামায়াত কীভাবে রাজনীতির মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এবারের নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দুটি দলই নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বিএনপির ইশতেহারে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণে রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণসহ বেশকিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জামায়াতের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দেড় দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি চারগুণ বাড়িয়ে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া।
সম্প্রতি ইশতেহার ঘোষণার সময় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জামায়াতের ইশতেহারে অর্থনীতি সম্প্রসারণের বিষয়ে চটকদার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ফলে অনেকেই একে স্লোগানসর্বস্ব ইশতেহার বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, জামায়াতের এই ইশতেহারকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই বলা চলে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জামায়াতকে দীর্ঘদিন এমন একটি দল হিসেবে দেখা হতো, যারা ধর্মীয় চেতনা দিয়ে প্রভাবিত এবং একটি তরুণ, বৈচিত্র্যময় ও আধুনিক জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। তবে এবারের ইশতেহারে তারা নিজেদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সম্প্রতি আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর এবারের নির্বাচনি ইশতেহার এরই মধ্যে জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহল ও বিদেশি কূটনীতিকরা দলটিকে রক্ষণশীল অভিধা দিয়ে প্রান্তিক বিবেচনা করত, এখন তারা অনেকেই তাদের অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে।
খবর অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে একাধিক পশ্চিমা দেশের কূটনীতিক দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে বলে খবর এসেছে। এক সময় যাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রায় ‘অচ্ছুত’ মনে করা হতো, এখন তাকে ঘিরে কূটনৈতিক আগ্রহ স্পষ্টভাবেই বেড়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামীর পথচলা সহজ ছিল না। দলটি একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিল। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও দমন-পীড়ন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন উদ্দীপনায় রাজনীতির মাঠে ফিরেছে জামায়াত।
এবারের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোট। এই জোটকে বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী মাঠেও জোটটি বেশ সক্রিয় এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বৈরাচার-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে, জোটপ্রধান হিসেবে শফিকুর রহমান কি আগামী দিনে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন?
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও দলটির নেতাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু একটি সরকারের পতনই নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোকেও ভেঙে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বের যে রাজনীতি এত দিন চলছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়ে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে দাঁড়ালেও রাজনৈতিক মাঠে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সেই জায়গা পূরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে সে সুযোগটি নিয়ে সামনে আসে জামায়াতে ইসলামী। কিছু জরিপে দলটিকে বিএনপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখা যাচ্ছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শফিকুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক কাজ, দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ফলেই এই উত্থান সম্ভব হয়েছে।’
২০১৯ সালে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় আমির হিসেবে দায়িত্ব নেন শফিকুর রহমান। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ছেলের জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ১৫ মাস পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার তার নাম মামলার তালিকা থেকে বাদ দেয়। এরপর থেকেই তার জনসমক্ষে উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘যত দিন আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি জনগণের জন্য লড়াই করে যাব। জামায়াত ক্ষমতায় এলে আমরা শাসক হব না, জনগণের সেবক হব। কোনো মন্ত্রী প্লট বা করমুক্ত গাড়ি নেবেন না। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি থাকবে না। তরুণদের আমি বলতে চাই, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।’
তবে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী একটি আলোচিত-সমালোচিত নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই এই কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে দলটি। দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে এর মাশুলও দিয়েছে দলটি। দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যত নিষিদ্ধই ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান ও পরবর্তী সময়ে নেতাদের বিচারের ইতিহাস এখনো দলটির পিছু ছাড়েনি। শফিকুর রহমান সম্প্রতি জামায়াতের ‘অতীতের ভুল’ স্বীকার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। যদিও নির্দিষ্ট দায় স্বীকার করেননি তিনি। সমালোচকদের মতে, এই অস্পষ্টতা ইচ্ছাকৃত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিনি জানেন ভুল কী ছিল। কিন্তু খোলাখুলি বললে দলের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হবে। শফিকুর রহমান আগের নেতাদের তুলনায় কিছুটা বেশি মধ্যপন্থি।’
অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন আবহে ফিরতে শুরু করেছে জামায়াত। ভাবমূর্তি বদলের আপ্রাণ প্রচেষ্টা অনেকটাই সফল হয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। বিশেষ করে সমর্থকরা দলের প্রধান শফিকুর রহমানকে সহজ-সরল ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখেন। এখন দলের প্রধান হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে তিনি দলের ভেতরে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
রাজধানী ঢাকার জামায়াত সমর্থক লোকমান হোসেন বলেন, ‘তিনি একজন ভালো মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করে। গত দেড় বছরে জামায়াত আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তবে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচন নয়, জামায়াতের সুনাম। দলটি নিজেকে আদর্শবাদী ইসলামপন্থি শক্তির চেয়ে দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও জবাবদিহিতার দল হিসেবে তুলে ধরতে চায়।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই রূপান্তর বাস্তব নাকি কৌশলগত, তাই নির্ধারণ করবে জামায়াতের ভবিষ্যৎ।
এবার নির্বাচনে জামায়াত প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। তবে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে দলটি এখনো সমালোচনার মুখে। আলজাজিরার সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কোনো নারী দলের প্রধান হতে পারবেন না।’ এই বক্তব্য নতুন করে সমালোচনা তৈরি করেছে। যদিও তারা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এই সমালোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তারা। কারণ ওই আন্দোলনই জামায়াতের জন্য নতুন করে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করে দিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ‘ন্যারেটিভস অব বাংলাদেশ’ বইয়ের লেখক মুবাশ্বার হাসান জামায়াতের ভেতরের সাংগঠনিক সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘দলটির যেসব নারী নেত্রী প্রকাশ্যে নেতৃত্ব ও লিঙ্গ ভূমিকা নিয়ে দলের অবস্থান সমর্থন করেন, তারাও আসলে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছেন। জামায়াতে নারী সমর্থক ও সদস্যের সংখ্যা কম নয়। এমনকি দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা মজলিসে শূরাতেও নারী সদস্য রয়েছেন। তবু বাস্তবে দলটির কাঠামো এমন যে, সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা আসে পুরুষ নেতৃত্ব থেকেই। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নারীরা মূলত দলের পুরুষ নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেন।’
মুবাশ্বার হাসান আরও বলেন, ‘পুরুষদের মতোই বরং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি নারীরা ওই আন্দোলনের অংশ ছিলেন।’ তার মতে, এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা বা নারীদের ভূমিকা খাটো করে দেখা জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
তরুণদের মধ্যে শফিকুর রহমানকে প্রায়ই ‘দাদু’ বলে ডাকা হয়। তার মৃদুভাষী আচরণ ও সম্মানজনক ভঙ্গি তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
চট্টগ্রামের আইন শিক্ষার্থী ও জামায়াত সমর্থক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘শফিকুর রহমান তার কথাবার্তার মধ্য দিয়েই তরুণদের সঙ্গে সহজে সংযোগ তৈরি করতে পারেন। শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এমন একটি আবেগী দিক আছে, যা একজন দাদা ও তার নাতি-নাতনির সম্পর্কের মতো মনে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির অনেক নেতা যেখানে তরুণদের গুরুত্ব দেন না বা ছোট করে দেখেন, সেখানে শফিকুর রহমান তরুণদের সম্মান দিয়ে কথা বলেন। তার জনপ্রিয়তা এখন জামায়াতের চিরাচরিত সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রচলিত সমর্থক বলয়ের বাইরেও তিনি বেশি গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।’