মানচিত্রে নেই-যায় না বিমান, ‘রহস্যময়’ যে দেশ কাঁপাচ্ছে নেটদুনিয়া

স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’-এর কথা মনে আছে? যেখানে প্রধান চরিত্রটি বিমানবন্দরে আটকা পড়ে যায়, কারণ মাঝপথে হঠাৎ করেই ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে পড়ে তার নিজের জন্মভূমি। সিনেমার গল্পটি পুরোপুরি কাল্পনিক হলেও পূর্ব ইউরোপের বুকে বাস্তবেই এমন একটি অদ্ভূত জায়গা রয়েছে, যার প্রাতিষ্ঠানিক বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কার্যত শূন্য।
সরকারিভাবে ‘প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটির সাধারণ নাম ট্রান্সনিস্ট্রিয়া।
মলদোভা ও ইউক্রেনের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত অঞ্চলটি ১৯৯০ সালে মলদোভা থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে মজার বিষয় হলো, তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র এটিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
অথচ বাস্তবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সব কিছুই রয়েছে এখানে। নিজস্ব জাতীয় পতাকা, সংসদ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মুদ্রা (রুবল), এমনকি ডাকটিকিটও। তা সত্ত্বেও গোটা বিশ্ব একে সোভিয়েত আমলের একটি জীবন্ত ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে গণ্য করে। সময় গড়ালেও এই ভূখণ্ডটি যেন সেই ১৯৯০-এর দশকের সোভিয়েত আমলেই থমকে আছে।
একসময় শুধুই ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকা ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এখন নেটদুনিয়ায় চর্চার কেন্দ্রে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের এই যুগে ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং ইউটিউব ভ্রমণ ভ্লগের বদৌলতে পর্যটকদের নজর কাড়ছে ‘অস্তিত্বহীন’ এই দেশ।
সোভিয়েত শৈলীর বিশাল স্থাপত্য, ভ্লাদিমির লেনিনের সুউচ্চ মূর্তি, রহস্যময় বাঙ্কার এবং নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত প্রাচীরচিত্রের কারণে অনেকেই একে বলেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের খোলা জাদুঘর’। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা নেই।
তবে ভৌগোলিক মানচিত্রে জায়গা না থাকলেও পর্যটকদের কৌতূহল কমেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় পর্যটকদের আগমন দ্বিগুণ হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২০ হাজার ভ্রমণপ্রেমী সেখানে পাড়ি জমান, যাদের বড় অংশই যান মলদোভা হয়ে। আন্তর্জাতিক এই আগ্রহকে পুঁজি করে ইতোমধ্যে রুশ ও ইংরেজি ভাষায় ভ্রমণ নির্দেশিকা (ট্রাভেল গাইড) প্রকাশ করেছে অঞ্চলটির কর্তৃপক্ষ।
কীভাবে যাবেন ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায়?
অঞ্চলটিতে প্রবেশ করা যেন সরাসরি ‘টাইম ট্রাভেল’ করার মতো অনুভূতি। যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে দেশের কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই এখানে নেই কোনো বিমানবন্দর বা সরাসরি ফ্লাইট। মলডোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে ‘মার্শরুটকা’ (স্থানীয় মিনিবাস)-এ চেপে তিরাসপোল বা বেন্ডারে পৌঁছাতে হয়।
কোনো ভিসার প্রয়োজন না হলেও সীমান্ত চেকপয়েন্টে পাসপোর্ট পরীক্ষা করে বিদেশি দর্শনার্থীদের বিশেষ সাময়িক প্রবেশপত্র দেয় স্থানীয় সীমান্ত রক্ষীরা।
পর্যটকদের বর্ণনায়, জায়গাটি একইসঙ্গে সোভিয়েত স্মৃতিবিজড়িত এবং ছোট শহরের প্রশান্তময় পরিবেশের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। রাজধানী তিরাসপোলের রাস্তাগুলো রুশ সেনা ও বিপ্লবীদের নামে নামকরণ করা। প্রধান সড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে লেনিনের বিশাল মূর্তি এবং নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের স্মৃতিরক্ষায় নির্মিত স্তম্ভ। এমনকি সরকারি ভবনগুলোর চূড়ায় এখনো জ্বলজ্বল করছে বিখ্যাত কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীক।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার ইতিহাস বেশ সংক্ষিপ্ত হলেও সংঘাতময়। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ ইউক্রেন ও ওডেসা অঞ্চলকে বোঝাতে ‘ট্রান্সনিস্ট্রিয়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯২ সালে রোমানীয় ভাষাভাষী অধ্যুষিত মলডোভার সঙ্গে এই রুশভাষী অঞ্চলটির চার মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এরপরই তারা নিজেদের আলাদা সত্তা হিসেবে দাবি করে।
মলদোভা এখনো পুরো অঞ্চলটির ওপর নিজস্ব মালিকানা দাবি করলেও এখানকার রুশভাষী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আনুগত্য রাশিয়ার প্রতি। ২০০৬ সালের এক গণভোটে এখানকার ৯৭ শতাংশ মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার শর্তে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
কলঙ্কিত অতীত, সাবেক রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির প্রভাব এবং অবৈধ অস্ত্রের আখড়া হিসেবে একসময় কুখ্যাতি ছিল জায়গাটির। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। একটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এদের গর্ব করার মতো প্রধান অনুসঙ্গ হলো ব্র্যান্ডি (মদ)।
কৃষ্ণসাগর ও দিনিস্টার নদীর তীরবর্তী উর্বর মাটি এবং নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। স্থানীয় বিখ্যাত ব্র্যান্ডি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেভিন্ট’ তাদের ক্যাবারনেট সভিনঁ-সহ ২০টিরও বেশি বৈচিত্র্যময় স্বাদের জন্য সমাদৃত।
অখ্যাত ও বিচ্ছিন্ন হলেও পর্যটকরা ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ অস্বীকৃত দেশ’ হিসেবে আখ্যা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে ভ্রমণকারীরা জানান, অঞ্চলটি অত্যন্ত নিরাপদ, স্থানীয়রা বেশ অতিথি পরায়ণ, আর জীবনযাত্রার খরচ ইউরোপের অন্য যেকোনো প্রান্তের তুলনায় বহুগুণে সস্তা।
থমকে যাওয়া সময়ের মাঝেও কিন্তু এখানে প্রাণচঞ্চলতার অভাব নেই। তিরাসপোলের ক্যাফেগুলোতে বাজে আধুনিক রুশ গান, ধূসর অ্যাপার্টমেন্টগুলোর নিচে শিশুরা ফুটবল খেলে, আর ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে বিক্রি হয় ঘরে তৈরি ওয়াইন ও স্মোকড চিজ।
বর্তমানে দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিজস্ব প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত হলেও এটি মূলত মস্কোর সামরিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর টিকিয়ে আছে। তাদের একমাত্র মিত্র হলো আন্তর্জাতিকভাবে অসংজ্ঞায়িত আরও দুই বিচ্ছিন্ন অঞ্চল আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওসেটিয়া।
সোভিয়েত ঐতিহ্য, অবিশ্বাস্য কম খরচ এবং রহস্যময় ইতিহাসের যুগলবন্দিতে ট্রাভেল ভ্লগাররা যাকে ডাকছেন ‘ইউরোপের শেষ সোভিয়েত রাষ্ট্র’ বলে। জাতিসংঘের খাতায় নাম না থাকলেও, ইতিহাস আর রোমাঞ্চকামী ভ্রমণপিপাসুদের মনে কিন্তু ট্রান্সনিস্ট্রিয়া ঠিকই নিজের এক আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে নিয়েছে।
