ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের হিসাবে গরমিল

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্যে ইরান কীভাবে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে এখন ভাবার সময় হয়েছে। ইসফাহান প্রদেশের নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে। শনিবার (২১ মার্চ) রাতে চালানো এ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি আঘাত হেনেছে ইসরায়েলি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের নিকটবর্তী আরাদ এবং ডিমোনা শহরে।
হামলায় অন্তত ১৮০ ইসরায়েলি নাগরিক আহত হয়েছেন বলে খাবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ডিমোনা ও আরাদ শহর থেকে শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এটিই সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে স্বীকার করেছেন, ইসরায়েল তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে একটি ‘অত্যন্ত কঠিন সন্ধ্যা’ পার করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি সাধারণ মানুষ এর আগে গাজা বা পশ্চিম তীরের সাথে হওয়া যুদ্ধে এতটা সরাসরি হামলার শিকার হননি। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণত সাধারণ মানের রকেট ব্যবহার করে থাকে, যা ইসরায়েলের জন্য সামলানো সহজ ছিল। কিন্তু ইরানের অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক সক্ষমতা ইসরায়েলের পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইসরায়েলে আহতের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকরা দাবি করে আসছিলেন, তারা যেকোনো ইরানি হামলা প্রতিহত করতে পুরোপুরি সক্ষম। কিন্তু ডিমোনার মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে ইরানি মিসাইলের আঘাত একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ইসরায়েল কি তবে ইরানের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছিল, নাকি তাদের হিসাবে গরমিল হয়েছে?
ইরান কী ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করছে
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কয়েক দশক ধরে তৈরি এই কর্মসূচিতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল রয়েছে। একটি আধুনিক বিমান বাহিনীর অভাব থাকা সত্ত্বেও তেহরানকে দূরপাল্লায় আঘাত হানার সক্ষমতা দিতেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে।
ইরানের কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ভূমি ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইল রয়েছে। ইরানের স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা প্রায় ১৫০ কিমি থেকে ৮০০ কিমি (৯৩ থেকে ৫০০ মাইল) এবং এগুলো নিকটবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও দ্রুত আঞ্চলিক হামলার জন্য তৈরি।
তাদের মূল ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাত্তাহ ভেরিয়েন্ট: জুলফিকার, কিয়াম-১ এবং পুরনো শাহাব-১/২ ক্ষেপণাস্ত্র। সংকটের সময় এগুলোর স্বল্প পাল্লা একটি সুবিধা হতে পারে। এগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে উৎক্ষেপণ করা যায়। এই ভেরিয়েন্টের ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, এগুলো সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় সংখ্যা কমিয়ে দেয় এবং আগাম প্রতিরোধ করা কঠিন করে তোলে।
মাঝারি পাল্লার সিস্টেমগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, ইমাদ, কদর-১, খোররামশাহর ভেরিয়েন্ট এবং সেজিল। তাদের কাছে খাইবার শেকান। এছাড়া, হাজ কাসেমের মতো নতুন ডিজাইনও রয়েছে।
ইরানের ভূমি ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইলগুলোর মধ্যে রয়েছে সুমার, ইয়া-আলি এবং কুদস ভেরিয়েন্ট, হোভেইজেহ, পাভেহ এবং রাদ।
আর দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘সুমার’ ২ হাজার কিমি থেকে আড়াই হাজার কিমি পর্যন্দ গিয়ে আঘাত হানতে পারে। তবে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বা শুক্রবার ভোরে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়াতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা ইরান থেকে ৪ হাজার কিমি দূরে অবস্থিত। যদিও যুক্তরাজ্য বলেছে এই হামলা ব্যর্থ হয়েছে এবং একজন ইরানি কর্মকর্তাও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এর আগে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার ২০০ কিমি পর্যন্ত সীমিত করেছিলেন। কিন্তু গত জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি সেই সীমা তুলে নেন। যুক্তরাষ্ট্রও সেই যুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে যোগ দিয়েছিল এবং ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে একদিন হামলা চালিয়েছিল।
ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক উজি রুবিন মার্কিন সংবাদ সংস্থা মিডিয়া লাইনকে বলেন, ইরান ইসরায়েলে হামলায় ক্লাস্টার মিউনিশন (গুচ্ছ বোমা) ব্যবহার করেছে। ইরানীদের কাছে থাকা প্রতিটি ধরণের ওয়ারহেডে ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে।
ক্লাস্টার মিউনিশন বা ওয়ারহেড কী?
একটি একক বিস্ফোরক পে লোডের পরিবর্তে, একটি ক্লাস্টার ওয়ারহেড অসংখ্য ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়।
ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ উজি রুবিন মিডিয়া লাইনকে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের অগ্রভাগে একটি বড় বিস্ফোরক ভর্তি ড্রামের পরিবর্তে এমন একটি মেকানিজম থাকে, যা অনেকগুলো ছোট ছোট বোমা ধরে রাখে। যখন ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এর বাইরের আবরণ খুলে যায় এবং এটি ঘুরতে থাকে। ফলে ছোট বোমাগুলো উন্মুক্ত হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটিতে পড়তে থাকে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের ধরণ অনুযায়ী ইরানের ক্লাস্টার ওয়ারহেডে ২০ থেকে ৩০টি অথবা ৭০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ছোট বোমা থাকতে পারে।
ইরানের জন্য এই যুদ্ধাস্ত্র নতুন কিছু নয়। জানা গেছে, গত ১২ দিনের যুদ্ধেও ইরান ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করেছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ওই যুদ্ধে ইরানের ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, লেবাননে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের জন্য ইসরায়েলকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২০০৮ সালে ‘কনভেনশন অন ক্লাস্টার মিউনিশন’ গ্রহণের মাধ্যমে এই যুদ্ধাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ইরান বা ইসরায়েল—কেউই এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
এই যুদ্ধে অস্ত্রগুলোর প্রভাব বেশি কেন
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরাদ এবং ডিমোনায় আঘাত হানা কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের এই অস্ত্রশস্ত্র ‘শেষ বা অপরিচিত’ কিছু নয় এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত চলছে। তাহলে কেন এই গুচ্ছ বোমাগুলো এখন প্রভাব ফেলছে? এর কয়েকটি কারণ রয়েছে।
কারণ স্পষ্ট, ক্ষেপণাস্ত্রের মূল অংশ খোলার এবং ছোট বোমাগুলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই একে বাধা দেওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একবার পেলোড খুলে গেলে, ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি একক আক্রমণের পরিবর্তে অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যা থামানো অত্যন্ত কঠিন।
গত বৃহস্পতিবার টাইমস অফ ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী এখন তাদের ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী মিসাইল) সাশ্রয় করতে শুরু করবে। সামরিক কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে তবে ইরানি গুচ্ছ বোমাগুলো খুব বেশি ক্ষতি করতে পারবে না—তাই তারা হয়তো সবকটি বোমা গুলি করে নামানোর ঝুঁকি এড়িয়ে চলছে।
এরপর কী হতে যাচ্ছে?
যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মতে, শনিবার (২১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি ইরানের অন্যতম প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাইট। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের প্রধান পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র সংলগ্ন আরাদ এবং ডিমোনা শহরে হামলা চালিয়েছে।
এর আগে ইসরায়েল তেহরানের জ্বালানি মজুদ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে ইরানি রাজধানীর আকাশে বিশাল বিষাক্ত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি কেন্দ্র খাড়গ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে এবং আবারও সেখানে হামলার হুমকি দিয়েছে।
ইরান বর্তমানে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও তেল পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া তারা আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং ইরান তা না মানলে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা শুরুর হুমকি দিয়েছেন। শনিবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যদি ইরান এখন থেকে ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো হুমকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করে দেবে এবং সবচেয়ে বড়টি দিয়েই তা শুরু হবে।
সূত্র: আলজাজিরা