logo

মার্কিন হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস

মার্কিন হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস

প্রায় এক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করা গেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বাকি অংশের একটি বড় অংশ এখনো অক্ষত বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় লুকানো রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংবেদনশীলতার কারণে তারা পরিচয় প্রকাশ করেনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র হয় মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নয়তো ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কারের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে—যেগুলোর প্রকৃত অবস্থা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। একই ধরনের চিত্র ইরানের ড্রোন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

এই মূল্যায়ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গে আংশিক বিরোধ তৈরি করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের হাতে এখন “খুব অল্প সংখ্যক রকেট” অবশিষ্ট আছে। তবে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ইরানের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে বা যুদ্ধ শেষে পুনরুদ্ধার সম্ভব।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ইরানের প্রকৃত ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের নিচে বিস্তৃত টানেল নেটওয়ার্ক ও ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে অস্ত্র সংরক্ষণ করে আসছে।

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ-উৎপাদন সক্ষমতার ৬৬ শতাংশের বেশি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং ইরানের বড় যুদ্ধজাহাজের প্রায় ৯২ শতাংশ অচল করে দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব দাবির মধ্যেও ইরান যে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েনি, তার প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবারই ইরান ১৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১১টি ড্রোন ছুড়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত মার্কিন-যুক্তরাজ্য ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ২,৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তাদের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ লঞ্চার নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তবে বাকি সক্ষমতা ধ্বংস করাই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ এগুলো অধিকাংশই গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সুরক্ষিত রয়েছে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি রয়টার্সকে বলেন, ইরান যেভাবে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে বোঝা যায় তাদের সক্ষমতা এখনো উল্লেখযোগ্য। তার মতে, ইরান এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথও ইরানের ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর জটিলতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ইরান বিস্তৃত টানেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা তাদের অস্ত্র গোপন রাখা এবং দ্রুত পুনরায় মোতায়েনের সুযোগ দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই সামরিক অভিযান বড় ধরনের ক্ষতি করলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—ভূগর্ভস্থ লুকানো অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করাই এই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন এবং অনিশ্চিত লক্ষ্য। 

সূত্র: রয়টার্স