চীনের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে কি নিখুঁত হামলা চালাচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ইরান চীনের তৈরি স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, চীনের বেইদৌ ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহারের ফলেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এতটা নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারছে।
ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা প্রধান অ্যালাইন জুলিয়েট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘গত বছর ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের তুলনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবার অনেক বেশি নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানছে। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, তারা বেইদৌ ন্যাভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও কিছু হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগে ইরান প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএসের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেই ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত বা ব্যাহত করতে পারে। বিপরীতে চীনের বেইদৌ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন নিয়ন্ত্রণ নেই।
তবে তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বেইদৌ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
বেইদৌ ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা কী
১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর নিজস্ব স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় চীন। তখন তাদের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র জিপিএস ব্যবহারে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। চীনের উদ্ভাবিত বেইদৌ ব্যবস্থায় অন্যান্য ন্যাভিগেশন সিস্টেমের তুলনায় বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় যেখানে ২৪টি স্যাটেলাইট কাজ করে, সেখানে বেইদৌতে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট।
২০২০ সালে চীন বৈশ্বিক স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা বেইদৌ ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ চালু করে। এ ছাড়া বিশ্বে আরও দুটি বড় ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা রয়েছে—রাশিয়ার গ্লোনাস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও। এ ধরনের ন্যাভিগেশন সিস্টেম স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সময়সংক্রান্ত সংকেতের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। প্রতিটি স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যসহ রেডিও সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত রিসিভারে পৌঁছাতে কত সময় লাগল তা হিসাব করে স্যাটেলাইটের সঙ্গে দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়। একসঙ্গে একাধিক স্যাটেলাইটের সংকেত ব্যবহার করে সেই দূরত্বগুলোর ছেদবিন্দু বের করা হয়, যার মাধ্যমে রিসিভারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ নাগরিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর নির্ভুলতা প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে থাকে। তবে সামরিক ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত সিগন্যাল আরও অনেক বেশি নির্ভুল হতে পারে।
ইরান কি সত্যিই বেইদৌ ব্যবহার করছে?
এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য নেই। এত অল্প সময়ের মধ্যে পুরো সামরিক ব্যবস্থা অন্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থায় সরিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান অনেক আগে থেকেই চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
চীন-ইরান সম্পর্ক নিয়ে গবেষক থিও নেনচিনি জানান, ২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোর সঙ্গে বেইদৌ ব্যবস্থাকে যুক্ত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এরপর ২০২১ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি হওয়ার পর এই সহযোগিতা আরও বাড়ে বলে ধারণা করা হয়। তখন থেকেই ইরানি সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নির্দেশনায় বেইদৌ ব্যবহারের কাজ শুরু করে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় জিপিএস ব্যবস্থায় ব্যাঘাতের কারণে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এরপরই ইরান পুরোপুরি বেইদৌ ব্যবস্থায় সরে যায়।
কেন এতে হামলা আরো নিখুঁত হতে পারে
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় আগে ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হতো। এতে জাইরোস্কোপ ও সেন্সরের মাধ্যমে গতিবেগ ও দিক নির্ধারণ করা হয়। তবে এই সিস্টেমে দীর্ঘ দূরত্বে হামলার ক্ষেত্রে ছোট ছোট ত্রুটির ফলে লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা কমে যেতে পারে।
স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার সংকেত ব্যবহার করলে এই ত্রুটি এড়ানো যায়। এতে ক্ষেপণাস্ত্রের পথ আরও নির্ভুলভাবে ঠিক করা সম্ভব হয়। আর যদি একাধিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তাতে সুবিধা আরও বেশি পাওয়া যায়। এতে সংকেত ব্যাহত বা জ্যাম করা কঠিন হয়।
ধারণা করা হয়, বেইদৌ ব্যবস্থার ত্রুটির সীমা এক মিটারেরও কম হতে পারে। ফলে লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা অনেক বেশি নির্ভুল হয়। এ ছাড়া এই ব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তি রয়েছে যা ভুয়া সংকেত বা ‘স্পুফিং’ শনাক্ত করতে পারে। এতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রকে ভুল নির্দেশনা দিয়ে বিভ্রান্ত করা কঠিন হয়ে যায়।
প্রভাব কতটা
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান সত্যিই বেইদৌ ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা পেয়ে থাকে, তাহলে তা যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, আধুনিক যুদ্ধে নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার উন্নতি এই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশও জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে।
একই সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধ চীনের জন্যও একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তারা নিজেরা যুদ্ধ না করেও নিজেদের প্রযুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা পরীক্ষা করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক ও সম্পাদক। তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফ ও সানডে টাইমসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি আম্মান ও ইস্তাম্বুলে ম্যাগাজিন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আলজাজিরার ‘এক্সপ্লেইনার’ বিভাগ থেকে অনূদিত।