logo

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় পরিণত হচ্ছে লেবানন

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় পরিণত হচ্ছে লেবানন
লেবাননের সিডনে আল-জাহরা মসজিদে ইসরায়েলি বিমান হামলার পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

লেবাননে এখন প্রতিদিনের দৃশ্য হলো, ইসরায়েলি বিমান হামলার পর চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, বাস্তুহারা মানুষের দিগ্বিদিক ছুটে চলা, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিত মানুষদের খোঁজে স্থানীয় ও উদ্ধারকর্মীদের দৌড়ঝাঁপ।

ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় সেখানে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ রূপ নিয়েছে, বিশ্লেষকদের থারণা ‘লেবাননের গাজাকরণ’ মিশনে নেমেছে ইসরায়েলিরা। গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসরায়েল যেসব বর্বরতাকে বিশ্ববাসীর চোখে একরকম নিয়ম বা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করেছে, ঠিক সেই একই বর্বরতা লেবাননেও প্রয়োগ করছে।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ দশ বছর ধরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার ফলে গাজার রূপ তুলে ধরেছেন।

তার মতে, গাজার নির্মম ইতিহাসের হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটছে লেবাননে। গাজায় যেভাবে স্কুলগুলোকে নিশানা করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এখন দক্ষিণ লেবাননের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। বাদ যাচ্ছে না হাসপাতাল ও ছোটখাটো ক্লিনিকও; সেখানেও বৃষ্টির মতো বোমা ফেলছে। সত্যকে আড়াল করতে গাজার মতো এখানেও নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে সাংবাদিকদের।

এর চেয়েও জঘন্য বিষয় হলো, উদ্ধারকাজে জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্যারামেডিক ও স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর চালানো হচ্ছে ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলা। কোনো একটি স্থানে প্রথমবার বোমাবর্ষণের পর যখন উদ্ধারকর্মীরা সেখানে আহতদের বাঁচাতে ছুটে যান, ঠিক তখনই সেখানে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়।

আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো এই কাপুরুষোচিত ও বেআইনি নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে ইতোমধ্যে শত শত ফিলিস্তিনি ও লেবাননি প্যারামেডিক প্রাণ হারিয়েছেন। গাজায় যেভাবে একের পর এক ফিলিস্তিনি পরিবারকে পৃথিবীর বুক থেকে পুরোপুরি মুছে দেওয়া হয়েছিল, লেবাননেও এখন একইভাবে পুরো বংশ বা পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাহাকার শোনা যাচ্ছে।

লেবাননে এই ‘গাজাকরণ’ নীতি কেবল যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধবিরতির নাম দিয়েও সমানতালে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলিরা।

ফিলিস্তিনের গাজার মতো লেবাননেও ‘ইয়েলো লাইন’ নামে সুরক্ষিত বাফার জোন তৈরি করেছে ইসরায়েল। এই লাইনে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের অভ্যন্তরে সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) পর্যন্ত একটি বিভাজন রেখা তৈরি করেছে। গাজার আদলে তৈরি এই সুরক্ষিত বাফার জোনটি ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে দাবি করে। এর উত্তর দিক থেকে কেউ এই সীমারেখার দিকে এগিয়ে এলে সরাসরি গুলি করার নির্দেশনা দিয়েশে ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যে ইসরায়েল সমানতালে হামলা অব্যাহত রেছে তার এর বড় প্রমাণ হলো এই ইয়েলো লাইনের অজুহাত। গাজায় প্রথম এই লাইন টেনে দেখতে দেখতে আজ সেখানকার ৬০ শতাংশ অঞ্চল দখলে নিয়েছে ইসরায়েল। এবার লেবাননেও একই কৌশল খাটিয়ে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা এই হলুদ রেখার পেটে চলে গেছে। আর এই অদৃশ্য সীমানা দুটি দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একপাক্ষিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়েও লেবাননের একের পর এক জনপদ ও এলাকা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এই পরিস্থিতি ঠিক গাজার নির্মম বাস্তবতারই প্রতিফলন। গাজায় যুদ্ধবিরতির নামে গত আট মাস ধরে ছদ্মবেশী সুযোগ নিয়ে বাইত হ্যানুন ও রাফাহর মতো সাজানো শহরগুলোকে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে দিয়েছে ইসরায়েল।