বর্ণাঢ্য আয়োজনে বর্ষবরণ পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে

বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উদযাপিত হচ্ছে বাংলা বর্ষবরণের উৎসব।
বাংলাদেশে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ পালিত হলেও বাংলা ক্যালেন্ডারে শুদ্ধিকরণের জেরে ভারতে বৈশাখের প্রথম দিন আজ বুধবার।
কলকাতায় পহেলা বৈশাখের উচ্ছ্বাস ঢাকার মতো না হলেও ঐতিহ্য ধরে রাখতে মরিয়া বেশ কিছু সংগঠন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেসকো কর্তৃক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। তার পরের বছর থেকে কলকাতায়ও শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। পাঞ্জাবে বৈশাখের প্রথম দিনটি পালিত হয় বৈশাখী উৎসব নামে, তামিলনাড়ুতে পুঠান্দু উৎসব, কেরালায় শুভ ভিশু উৎসব, আসামে বোহাগ বিহু উৎসব এবং উড়িষ্যায় পানা সংক্রান্তি নামে পালন করা হয় দিনটি।
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, বহরমপুর, কৃষ্ণনগরসহ ১৫টি জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। তবে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া এলাকায় আজ হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে ‘বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদ’। মঙ্গলবার রাত থেকেই দীর্ঘ পাঁচ কিলোমিটার এই শোভাযাত্রার জন্য রাস্তা সাজিয়ে তোলা হয় আল্পনায়।
বাংলাদেশের আদলে ঢাকুরিয়ার শোভাযাত্রায় ছিল রণ পা, বাঘ ঘোড়া হাতির মুখোশ সহ নানা রকমের মুখোশ, বাংলার ঐতিহ্যের নানা লোকজ প্রতীক, মওলানা ভাসানী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ সম্পর্কিত নানা ছবি ও বাণী। ছিল বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্প, পটশিল্প।
চলতি বছর মঙ্গল শোভাযাত্রার থিম, বাঙালির নাগরিকত্বের সংকট! বর্তমান সামাজিক পটভূমিতে নাগরিকত্ব হারিয়ে নতুন করে বাঙালির উদ্বাস্তু হওয়ার চালচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শোভাযাত্রায়। যেখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একজন নারীর মাথায় বাক্স পেটরা নিয়ে উদ্বাস্তু হওয়ার পটভূমি, মাথার ধরে থাকা সেই বাক্সে লেখা রয়েছে রক্ত দিয়ে কেনা মাটি, কাগজ দিয়ে নয়। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালির মাছ মাংস খাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে সেই ইস্যুও তুলে ধরা হয়। মাছে ভাতে বাঙালি স্লোগানও ফুটিয়ে তোলা হয় রংতুলিতে। শোভাযাত্রায় প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ছিল মাছের প্রতিকৃতিও।
বাড়তি আকর্ষণ ছিল গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পালকি। ছিল প্রায় দেড়শ ধরনের তালপাতার সেপাই। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় অংশ নেয় স্কুলের শিশুরা। ছিলেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার ফুটবলার নিমাই গোস্বামী, শান্ত মিত্র, লেখক গজেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রয়াত লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে গায়িকা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বজনরা।
এদিকে বাংলাদেশের নববর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবছরই নববর্ষ উৎসব আয়োজন করে কলকাতার ভাষা ও চেতনা সমিতি। গতকাল দিনভর কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনের ছাতিমতলায় নাচ, গান কবিতা ও নাটকের মধ্যে পালন করা হয় বাংলা নববর্ষ। আয়োজক অধ্যাপক ইমানুল হক জানান, বুধবার ভারতের নববর্ষেও দিনভর চলবে এই আয়োজন।
পার্ক স্ট্রিট জাদুঘরের পাশে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের সামনে থেকে একাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে রানুছায়া মঞ্চ পর্যন্ত আয়োজন করা হয় শোভাযাত্রার। পান্তা, শুঁটকি, আলু ভর্তা, চিংড়ি ও আম পোড়া শরবত খেয়ে নববর্ষে বাংলাদেশের আমেজ কলকাতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করে কলকাতার ভাষা ও চেতনা সমিতি।
কলকাতার মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা সিদ্ধার্থ বসু বলেন, নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। একইসঙ্গে সর্ব ধমের্র সমন্বয়ের উৎসব। তবে শুধু বাঙালিরাই আসে এখানে এমনটা নয়। বহু জাতিধর্ম পেশার মানুষ আসেন। বর্তমানে ভারতে যা অবস্থা তাতে বাঙালির ঐতিহ্যকে রক্ষা করা খুব প্রয়োজন। বাইরে থেকে হিন্দি বলয়ের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বাংলা ভাষার ওপর, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের ওপর আগ্রাসনের প্রতিবাদে এই শোভাযাত্রার আমার মনে হয় একটা প্রতিবাদের মিছিল।
মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা বুদ্ধদেব ঘোষ বলেন, চারদিকে যখন দেখছি ভেদাভেদ হচ্ছে, চারদিকে জাতের বিভেদ, ধর্মের বিভেদ তখন আমরা প্রকৃতই মনে করি হাজার বছরের বাঙালির যে সংস্কৃতি সেটা মিলনের সংস্কৃতি। সবাই মিলেমিশে আমরা হাজার বছর আছি এবং হাজার বছর চলতে চাই। আর এর জন্যই আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী নারীরা বলেন, যা কিছু শুভ তা আমরা নববর্ষে সূচনা করি। এর মাধ্যমে যেন সব দুর্নীতি দূর হয়, জাতপাত ধর্ম-বর্ণের বৈষম্য দূর হয়। আমরা যেন মানুষকে ভালোবাসতে পারি।
ছোট পরিসরে ঢাকার আদলে কলকাতার সল্টলেক, হুগলির শ্রীরামপুর, সুন্দরবন অঞ্চলে স্বল্প আকারে আয়োজন করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীরা আয়োজন করে প্রভাতফেরির। বাংলার দুই প্রধান ফুটবল ক্লাব ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানে বার পুজো সম্পন্ন হয় এদিন। তবে গত কয়েক বছরের মতো এবারও নববর্ষে নতুন কোনো আয়োজন বা শোভাযাত্রার আয়োজন করেনি কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাস।