logo

আফগানিস্তানের সামরিক শক্তি কতটা, দেশটিতে কী ধরনের অস্ত্র আছে

আফগানিস্তানের সামরিক শক্তি কতটা, দেশটিতে কী ধরনের অস্ত্র আছে

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে এখন ভয়াবহ অস্থিরতা বিরাজ করছে। দেশ দুটি আবারও সংঘাতে জড়িয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার দাবি করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রয়ারি) আফগান তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন, দুই দেশের সীমান্তে পাকিস্তানি চেকপোস্টে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের একাধিক পোস্ট দখল করা হয়েছে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে।

এর জবাবে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে তালেবানের দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবান সরকারের উসকানিহীন গুলিবর্ষণের যথাযথ ও কার্যকর জবাব দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দাবি করেন, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা হামলায় আফগান তালেবানের ৩৬ জন সদস্য নিহত হয়েছে। তিনি সীমান্ত সংঘর্ষে দুই পাকিস্তানি সেনার মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেন।

যদিও শুক্রবার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করে জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের ভেতরে ২২টি স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। এই হামলায় ২৭৪ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। সংঘাতে এ পর্যন্ত ১২ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলে জানান তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও আফগান তালেবানের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানে বিমান হামলায় সাতটি জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছিল পাকিস্তান। সামরিক সূত্র জানায়, এসব অভিযানে ৮০ জনেরও বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে।

জবাবে আফগানিস্তানে তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে পাকিস্তানি বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সতর্ক করেছে যে এসব হামলার ‘উপযুক্ত সময়ে পূর্ণাঙ্গ জবাব দেওয়া হবে’।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে কাবুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এর ফলে সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বহু হতাহত হয়েছে।

পাকিস্তান সরকার ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছে যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন টিটিপিকে (তেহরিক-এ-তালেবান পাকিস্তান) সমর্থন দিচ্ছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার।

তবে আফগান তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার পরামর্শ দেয়।

গত বছর দুই দেশের মধ্যে হওয়া সীমান্ত সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পরও দুই দেশের টানাপোড়েন কমেনি। সাম্প্রতিক উত্তেজনা সে তিক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এখন দুই পক্ষের তীব্র সংঘর্ষের পর প্রশ্ন হচ্ছে সামনে কী হবে, আফগান তালেবানদের সামরিক সক্ষমতা কতটুকু এবং আগামী দিনে কী ঘটতে পারে?

আফগানিস্তানের সামরিক শক্তি কতটা

তালেবান বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্র মূলত তিনটি উৎস থেকে এসেছে, সাবেক আফগান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র, দেশ ছেড়ে যাওয়া বিদেশি বাহিনীর রেখে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম এবং কালোবাজারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নতুন করে সংগ্রহ করা অস্ত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের সীমান্ত সংঘর্ষের ভিডিওতে দেখা যায়, তালেবান বাহিনী বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে হালকা অস্ত্র ব্যবহার করেছে, ভারী বা দূরপাল্লার অস্ত্র সেভাবে দেখা যায়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠনবিষয়ক বিশেষ পরিদর্শক এবং দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ২০ বছরের সময়কালে ১৬ লাখের বেশি হালকা ও ভারী অস্ত্র এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম দেশটির সাবেক সরকারকে সরবরাহ করা হয়েছিল।

এর প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখের বেশি অস্ত্র তালেবানের হাতে চলে যায়।

বর্তমানে তালেবান সরকারের বাহিনীর হাতে থাকা হালকা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে কালাশনিকভ, আমেরিকান এম-১৬, এম-৪, এম-২৯ হালকা মেশিনগান। এ ছাড়া পিকে এম-টু ও এম-২৪০ এর মতো ভারী মেশিনগান, গ্রেনেড লঞ্চার, রকেট লঞ্চার, আরপিজি-৭, এটিফোর এর মতো ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের (পেন্টাগন) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক আফগান সরকারের সেনাবাহিনীকে আমেরিকা যে ভারী সাঁজোয়া যান, বিমান এবং অন্যান্য ভারী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল তাও তালেবানদের হাতে চলে গেছে।

সেসব ভারী অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১২২ মিলিমিটার হাউইটজার আর্টিলারি কামান, যা ডি-৩০ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এ ধরনের ১০০ থেকে ১২০টি কামান এখনো আফগানিস্তানে রয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ১৫৫ মিলিমিটার হাউইটজার মর্টার এবং জেডটি-২-২৩ এর মতো অনেক রাশিয়ান অস্ত্রও তালেবানের কাছে রয়েছে।

২০২৪ সালে তালেবান সরকার বাগরাম বিমান ঘাঁটিতে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে তাদের ভারী অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল। এর মধ্যে ছিল আর-১৭ স্কাড মিসাইল ও আলব্রুস আর-৩০০, যেগুলোর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম।

লুনা মিসাইল যা ফ্রগ-৭ নামেও পরিচিত, গ্র্যাড রকেট লঞ্চার, মিলান অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল, এবং অর্গান মিসাইল ব্যবস্থাও রয়েছে। এর কিছু অস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৬ মাইল, আবার কিছু ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।

এই অস্ত্রগুলো অন্তত তিন দশক ধরে আফগানিস্তানে ব্যবহার করা হয়নি। কিছু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং কিছু পাহাড়ি এলাকা যেমন পানজশিরে রয়েছে।

তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা এসব অস্ত্রের কিছু পুনরায় সক্রিয় করেছে। তবে সেগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা এবং বাস্তব যুদ্ধে কতটা ব্যবহারযোগ্য, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

তবে পাকিস্তানের একটি বড় সুবিধার জায়গা পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ও আধুনিক যুদ্ধবিমান। তালেবান সরকারের কাছে এর সমতুল্য বিমানবাহিনী নেই।

ছবি : সংগৃহীত

তালেবান সরকার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক হেলিকপ্টার মেরামত করে সচল করেছে এবং কয়েকজন পাইলটকে প্রশিক্ষণও দিয়েছে।

আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বিসমিল্লাহ তাবান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের উপস্থিতির শেষ বছরগুলোতে আফগান বিমানবাহিনীকে পুরোপুরি সজ্জিত করেনি এবং বহু আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করে দিয়েছে। এই কারণেই তালেবানের কাছে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপ করার মতো অস্ত্র নেই।

তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তাদের কাছে প্রায় ৬০টি বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে।

মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬১ হাজার হামভি, রেঞ্জার এবং শত শত সাঁজোয়া যান তালেবান দখল করেছে। তবে সাবেক আফগান সরকারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, এসব সাঁজোয়া যান যুদ্ধের সময় রাবারের টায়ারের কারণে সমস্যায় পড়েছে।

পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা

সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা : পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বর্তমানে ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে আছে ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য, বিমানবাহিনীতে ৭০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে ৩০ হাজার সদস্য।

যুদ্ধযান ও কামান : পাকিস্তানের ৬ হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং ৪ হাজার ৬০০-র বেশি কামান রয়েছে।

বিমানবাহিনী : আকাশপথের শক্তিতে পাকিস্তান অনেকখানি এগিয়ে। দেশটির বিমানবহরে ৪৬৫টি যুদ্ধবিমান এবং ২৬০টিরও বেশি হেলিকপ্টার রয়েছে। এর মধ্যে বহুমুখী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম, আক্রমণাত্মক এবং পরিবহন কপ্টারও আছে।

পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার : পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং বর্তমানে তাদের কাছে ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার নেই।

সূত্র : বিবিসি বাংলা