logo

যুদ্ধের মধ্যেও ইরান থেকে কীভাবে খবর পাঠান সাংবাদিকরা

যুদ্ধের মধ্যেও ইরান থেকে কীভাবে খবর পাঠান সাংবাদিকরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) কমপ্লেক্স। স্থাপনাটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত সোমবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের জনগণকে তেহরানের এভিন এলাকা ও তার আশপাশের অঞ্চল এড়িয়ে চলতে সতর্ক করেছিল। ওই অঞ্চলেই মূলত রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি অবস্থিত। শুধু আইআরআইবি না, ওই এলাকায় রয়েছে কুখ্যাত এভিন কারাগার।

গত বছর ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং ওই হামলায় তখন কারাগারটিতে কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কেউ ছিলেন কারাগারের কর্মী, কেউ বন্দি এবং ওই তালিকায় ছিলেন বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা পরিবারের সদস্যরাও।

বহু রাজনৈতিক বন্দি ও গ্রেপ্তার হওয়া মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে বর্তমানে সেখানে একজন বিদেশি সাংবাদিকও আছেন বলে মনে করা হয়। যে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক গত মাসে বিক্ষোভ দমনের সময়ও ইরান থেকে রিপোর্ট করছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মাঝে অন্যতম।

প্রাগভিত্তিক ফার্সি ভাষার সংবাদমাধ্যম রেডিও ফারদা দুইটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের তেহরান ব্যুরো প্রধান শিনোসুকে কাওয়াশিমাকে গত ২০ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পর এভিন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) বলেছে, এই আটক থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ স্বাধীন সাংবাদিকতাকে চুপ করিয়ে দিতে সচেতনভাবে চেষ্টা করছে, যাতে সাংবাদিকরা নীরব থাকে এবং কাজ চালিয়ে যেতে ভয় পায়।

সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপে বাধ্য করা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া।’

ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। অনেকের মতে, তথ্য বাইরে যেতে না দেওয়ার জন্যই এমনটি করা হয়েছিল। এর আগেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষ এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে ওই সময় সীমান্তবর্তী কিছু এলাকার মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন। আর খুব অল্পসংখ্যক মানুষ স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন, যদিও ইরানে স্টারলিংক ডিভাইস রাখা বেআইনি।

এখনো ইরানে প্রায় পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস। তবে মাঝেমধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাচ্ছে।

ইরানে সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই নিষিদ্ধ, সেটি ইন্টারনেট সেবা চালু থাকলেও। তাই এসব ব্যবহারের জন্য মানুষকে ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করতে হয়।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পোস্ট অনেক কমে গেছে। তবে কিছু সরকারি কর্মকর্তা, সরকার সমর্থক কট্টরপন্থি ব্যক্তিরা ও বিশ্লেষকরা এখনও সেখানে পোস্ট করছেন।

ধারণা করা হয়, তারা অনুমোদিত ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করছেন অথবা তাদেরকে ‘হোয়াইট সিম কার্ড’ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বাধাহীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়।

খবরে বলা হয়েছে, আবেদন করার পর কিছু সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদেরকে এই হোয়াইট সিম কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে সত্য ঘটনা তুলে ধরা খুবই কঠিন এবং সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে না মিললে ইরানের ভেতরে সাংবাদিকদের জন্য কাজ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

কারণ দেশটির সব স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সরকারের অনুমোদিত বয়ানের বাইরে কিছু বললে তা সাধারণত সহ্য করা হয় না।

ইরানের ভেতরে কোন কোন বিদেশি গণমাধ্যম কাজ করছে?

ইরান থেকে এখনও কয়েকটি বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল সংবাদ প্রচার করছে। এর মধ্যে রয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরা, সৌদি আরবের আল অ্যারাবিয়া, বৈরুতভিত্তিক আল মায়াদিন এবং রাশিয়ার আরটি অ্যারাবিক।

ইরানের নিজস্ব চ্যানেল আল আলাম টিভিও তেহরান থেকেই সম্প্রচার করে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এই চ্যানেল আরবিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া, ইরানে কয়েকটি বড় তুর্কি গণমাধ্যমেরও উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে আছে ইরানের রাষ্ট্রীয় চ্যানেল টিআরটি হাবের, সরকারপন্থি এ হাবের, মূলধারার এনটিভি এবং রাশিয়াপন্থি উলুসাল কানাল।

তুরস্কের বড় সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে এমনভাবে খবর করে, যাতে তুরস্ক সরকারের সতর্ক অবস্থানই প্রতিফলিত হয়। অন্যদিকে, অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরানে নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত। তারা সাধারণত এমন বিষয় এড়িয়ে চলে যেগুলো ইরানি সরকার সংবেদনশীল মনে করে।

ইরানে বিদেশি সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ কেমন?

ইরানে ঢোকার আগে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রেস ভিসা ও অনুমোদন নিতে হয়, যা দেয় মিনিস্ট্রি অব কালচার অ্যান্ড ইসলামিক গাইডেন্স। সাধারণত ইরানে প্রবেশের আগেই সেখানে বিস্তারিত রিপোর্টিং পরিকল্পনা জমা দিতে হয় এবং সেই পরিকল্পনা মেনেই কাজ করতে হয়।

পরিকল্পনার বাইরে গেলে সতর্কবার্তা, অনুমতি বাতিল বা দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

বিদেশি সাংবাদিকদের চলাফেরা ও কাজের সুযোগও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। তারা সাধারণত সরকার অনুমোদিত স্থানীয় সহায়তাকারীর (লোকাল ফিক্সার) সঙ্গে কাজ করেন এবং বড় শহরের বাইরে যেতে হলে আগে সরকারের অনুমতি নিতে হয়।

ইরানের সংবাদমাধ্যম ও দণ্ডবিধিতে এমন অনেক ধারা আছে, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা, পাবলিক অর্ডার বা জনশৃঙ্খলা এবং ইসলামি নীতির জন্য ক্ষতিকর মনে হলে কোনো বিষয় প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। এই আইনের কারণে কর্তৃপক্ষ চাইলে সহজেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার’ অভিযোগ আনতে পারে।

তেহরানে কিছু বিদেশি গণমাধ্যমের অফিস থাকলেও সেখানে কাজের পরিবেশ খুবই সীমাবদ্ধ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে এই বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়ে যেতে পারে।

ইরানে বিদেশি সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ কখন শুরু হয়?

বিতর্কিত ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে মীর হোসেইন মৌসাভির ওপর বিজয়ী ঘোষণার পর ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষ কঠোর দমন শুরু করে এবং বিদেশি গণমাধ্যমের ওপর কঠিন সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

আন্তর্জাতিক সংবাদদাতাদের বহিষ্কার করা হয়, অফিস বা হোটেলে অবরুদ্ধ রাখা হয় অথবা বিক্ষোভের সংবাদ কাভার করা নিষিদ্ধ করা হয়। প্রেস ভিসা পাওয়া বা নবায়ন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে এবং স্বীকৃতি বা অনুমোদন সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর হয়।

ইরান অতীতেও গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ দিয়েছিল, তবে ২০০৯–এর পরের সময় থেকেই চলমান রাজনৈতিক প্রতিবেদন, চলাচল ও প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে কঠোর হয়ে ওঠে, যা এখনকার পরিস্থিতিকে বুঝতেও সাহায্য করে।

এরপরের বিভিন্ন দফায় বিক্ষোভ অর্থাৎ ২০১৭–১৮, ২০১৯ এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে আন্দোলন অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা ও সাময়িক বহিষ্কারের নতুন ধাপ সৃষ্টি করে।

বিদেশ থেকে ইরান নিয়ে রিপোর্টিং করা সাংবাদিকদের জন্য কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

বিদেশে বসে রিপোর্ট করা সাংবাদিকরাও চাপের মুখে পড়েছেন। ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারকে দেশের ভেতরে হয়রানি বা ভীতি প্রদর্শনের নিশানা করেছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিবিসি ফার্সি টিভি চালুর পর থেকে সংস্থার কর্মীরা হুমকি ও আইনি ভীতিপ্রদর্শনের মুখে পড়ছেন।

লন্ডনভিত্তিক আরও দুটি ফার্সি ভাষার চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনাল এবং মানোটোকে ‘সন্ত্রাসী’ মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন এবং একজন সাংবাদিক লন্ডনে গুরুতর আহত হয়েছেন। একপর্যায়ে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা গুরুতর হুমকি আটকানোর পর তাদের অফিস সাময়িকভাবে পুলিশের সুরক্ষায় বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বড় জাতীয় উদযাপন উপলক্ষে ইরান সাময়িকভাবে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়, যদিও কঠোর শর্তে। আইআরআইবি–নির্বাহী উদ্যোগগুলোও দেখা যায়, যেখানে নির্বাচিত স্বাধীন সাংবাদিক ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ইরানি গণমাধ্যম জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী কাভার করতে দুই শতাধিক বিদেশি রিপোর্টার ও ক্যামেরা ক্রু উপস্থিত থাকবে। বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট তেহরান থেকে রিপোর্ট করেন, শর্ত ছিল তার কোনো উপাদান বিবিসি ফার্সি সার্ভিসে ব্যবহার করা যাবে না।

বার্ষিকীর আগে, আইআরআইবি–সম্পৃক্ত একটি গণমাধ্যম কেন্দ্র বিদেশি সাংবাদিক ও ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য কড়া নিয়ন্ত্রণে একটি মিডিয়া ট্যুর আয়োজন করে। দলটিকে ইরানে আনা হয়, তখন রাস্তায় সরকারপন্থি সমাবেশ চলছিল।

অংশগ্রহণকারীদের বার্ষিকীর র‍্যালি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের এয়ারস্পেস ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনী এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারির অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের পোস্ট করা ভিডিও ও রিপোর্টগুলোতে মূলত সরকারের বর্ণনাই প্রতিফলিত হয়।

আমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট প্যাট্রিক হেনিংসেন, পাকিস্তানি–ব্রিটিশ ভাষ্যকার বুশরা শাইখ এবং মার্কিন রাজনৈতিককর্মী কালা ওয়ালশ।

একটি বহুল শেয়ার হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শাইখ জনসমক্ষে হিজাব ছাড়া হাঁটছেন—যেটিকে তিনি বর্ণনা করেন এভাবে যে পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানি নারীদের স্বাধীনতা ভুলভাবে তুলে ধরে। তবে মিসাইল প্রদর্শনীতে এবং রাষ্ট্রীয় টিভির স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারের সময় তাকে হিজাব পরা অবস্থায় দেখা যায়।

সংক্ষেপে, বিদেশি সম্প্রচারকারীরা ইরান থেকে রিপোর্ট করতে পারে, তবে কেবল রাষ্ট্র থেকে নির্ধারিত শর্তাবলীর ভিত্তিতে - এমন পরিস্থিতি যা তাদের তথ্য প্রাপ্তি এবং তাদের বলা গল্প উভয়কেই প্রভাবিত করে।

বিবিসি ফার্সি হলো বিবিসি নিউজের ফার্সি ভাষার পরিষেবা, যা বিশ্বজুড়ে দুই কোটি ৪০ লাখ মিলিয়ন মানুষ ব্যবহার করে—যাদের বেশিরভাগই ইরানে—যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এই পরিষেবাটি ব্লক করে রেখেছে এবং নিয়মিতভাবে সংকেত বিঘ্ন ঘটায়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা