logo

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানের জাহাজে টর্পেডো ছুড়ল যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানের জাহাজে টর্পেডো ছুড়ল যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব আবারও নৌ যুদ্ধের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো। ১৯৪৫ সালের পর মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে প্রথম কোনো যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে। 

বুধবার (৪ মার্চ) ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর ছোড়া মাত্র একটি টর্পেডোর আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে ইরানের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দেনা। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিলিটারি টাইমস। 

পেন্টাগনে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই অভিযানের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি এই হামলাকে ‘নিস্তব্ধ মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ, কিন্তু একটি টর্পেডোর আঘাতেই সেটি সাগরের তলদেশে চলে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে ঘাতক সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।

বুধবার সকালে প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজটির পেছনের অংশে একটি টর্পেডো আঘাত হানছে এবং বিশাল জলরাশি আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। হামলায় যুদ্ধজাহাজটির মূল কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হতে দেখা যায়।

এ ছাড়া জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিষয়টিকে পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন, টর্পেডোটি ‘তাৎক্ষণিক প্রভাব’ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

কেইন জানান, বর্তমান অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানের ২ হাজারটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ইরানের ২০টিরও বেশি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানের ফলে ওই অঞ্চলে ইরানের নৌ শক্তি কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। 

শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ৩২ জন ইরানি নাবিককে উদ্ধার করেছেন। জাহাজটিতে ১৮০ জন ক্রু ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৮৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

সর্বশেষ ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন সাবমেরিন ‘ইউএসএস টর্স্ক’ থেকে শত্রুপক্ষের জাহাজে টর্পেডো ছোড়া হয়েছিল। তখন জাপানের একটি ৭৫০ টনের জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল সেটি। ইউএস নেভি হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। 

এরপর থেকে স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মার্কিন সাবমেরিনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সংবেদনশীল গোয়েন্দা মিশনে নিয়োজিত থাকলেও কোনো জাহাজ ডোবানোর কাজে টর্পেডো ব্যবহার করেনি। তবে ১৯৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং গত জুনে ইরানের ইস্পাহানে পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলায় সাবমেরিন থেকে নিয়মিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে।

জেনারেল কেইন জানান, ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডোবাতে ‘মার্ক-৪৮’ হেভিওয়েট টর্পেডো ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই টর্পেডোটি সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পাউন্ড ওজনের এই টর্পেডো সোনার ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট গ্যাসের বুদ্বুদ জাহাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই টুকরো হয়ে ডুবে যায়।

সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন সাবমেরিন থেকে খুব সম্ভবত এমকে-৪৮ টর্পেডো ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে, ইরানের জন্য এটি বিশাল ধাক্কা। সাবমেরিনের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে এই নিখুঁত আক্রমণ প্রমাণ করে যে, ইরান ও তার মিত্রদের জন্য ভারত মহাসাগরের কোনো অংশই আর নিরাপদ নয়। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে যুদ্ধের উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।