নিজেদের অতিথি জাহাজের নিরাপত্তা দিতেই ব্যর্থ ভারত মহাসাগরের ‘রক্ষক’ রাষ্ট্রটি

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন হামলায় ভারত সাগরে ডুবে গেছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ। গত বুধবার (৪ মার্চ) ভারতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘মিলান’ নামে বহুপাক্ষিক নৌ-মহড়া শেষে দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায় ইরানি জাহাজ আইআরআইএস ডেনা।
এই মহড়ায় অংশ নেওয়া নাবিকদের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু। তবে এ ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর সময় লেগে যায় এক দিনেরও বেশি।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের ভারত মহাসাগর অঞ্চলের রক্ষক মনে করে আসছে। গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে নয়াদিল্লিতে নৌবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি বরাবরের মতোই ঘোষণা করেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনীই ভারত মহাসাগরের রক্ষক।’ এ সময় উপস্থিত নৌবাহিনীর সদস্যরা ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনি দিয়ে তাকে সমর্থন দেন। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের কম সময়ে সেই দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবারের ঘটনায় দেখা গেছে, নিজেদের আমন্ত্রণে আসা এক বিদেশি অতিথি নৌযানের নিরাপত্তাও দিতে পারেনি তারা। এ ঘটনায় নিজেদের ‘ভারত মহাসাগরের রক্ষক’—এই দাবি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এদিকে ইরানি জাহাজ ধ্বংসের বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এই হামলা ছিল ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ সম্প্রসারণের প্রস্তুতির অংশ। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনে বলেন, ‘একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় সে নিরাপদ। কিন্তু একটি টর্পেডোর আঘাতে সেটি ডুবে গেছে। নীরব মৃত্যু।’
নিজ দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে নিজেদের যুদ্ধজাহাজে হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ইরান। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, ‘আইআরআইএস ডেনা ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর অতিথি, যারা নয়াদিল্লির আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত মহড়ায় অংশ নিয়ে ফিরছিল।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘ইরানের উপকূল থেকে প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে সমুদ্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি নৃশংসতা চালিয়েছে। মনে রাখবেন, এই নজির স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে একদিন চড়া মূল্য দিতে হবে।’
ভারতের অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় কেবল একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিই হয়নি, ভারত মহাসাগরে নিজেকে ‘রক্ষক’ বা নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে যে দাবি করে আসছিল, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা ভারতের নিজস্ব সামুদ্রিক অঞ্চলে তাদের ক্ষমতা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ভারতের পূর্ব উপকূলের বিশাখাপত্তনম বন্দর থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করেছিল আইআরআইএস ডেনা। স্থানীয় সময় ৪ মার্চ ভোরে শ্রীলঙ্কার জলসীমার ঠিক দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেটিতে হামলা হয়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর উদ্ধারকারীরা ৮০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে যুদ্ধজাহাজটির কমান্ডার ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানা গেছে। আরও শতাধিক নাবিক এখনো নিখোঁজ।
ভারতের নৌবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড আগে টুইটে জানিয়েছিল, ডেনার আগমন ইরান ও ভারতের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা জানিয়েছেন, তিনি ওই অনুষ্ঠানে ইরানি নাবিকদের কুচকাওয়াজ দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা নাবিকদের কুচকাওয়াজ খুবই ভালো লেগেছিল। একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া সব সময়ই দুঃখজনক। কিন্তু যুদ্ধে আবেগের জায়গা নেই—যুদ্ধে নৈতিকতারও খুব বেশি স্থান থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের কৌশলগত ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগর আগে তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, বাস্তবতা ভিন্ন।’
শেখর সিনহা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত এখন ভারতের উঠানে পৌঁছে গেছে। নয়াদিল্লির অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। ভারত মহাসাগরে যে স্বাধীনতা আমরা এতদিন ভোগ করেছি, তা স্পষ্টতই সংকুচিত হয়েছে।’
টর্পেডো হামলার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। তারা জানায়, ইরানি জাহাজ থেকে বিপদসংকেত পাওয়ার পর উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে ততক্ষণে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান পরিচালনা শুরু করে দেয়।
তবে এই ঘটনার পরও নয়াদিল্লি বা ভারতীয় নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের কোনো সমালোচনা করেনি।
সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক নৌ কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত এখন এক ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কি আগে থেকেই জানত যে ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে, নাকি তাদের অজান্তেই একটি পারমাণবিক সাবমেরিন এসে এই হামলা চালিয়ে গেছে?’
ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেন, ‘যদি নয়াদিল্লি এ বিষয়ে কিছুই না জেনে থাকে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রশ্ন তোলে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে।’
আর যদি ভারত আগে থেকেই বিষয়টি জানে, তবে অনেকের কাছে সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়া হিসেবে দেখা হবে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের পরিচালক এবং অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা সি উদয় ভাস্করের মতে, ‘ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা অঞ্চলটিতে নিজেকে নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে দেখার ভারতের ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এটি ভারতের জন্য কৌশলগত বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। পাশাপাশি সরকারের প্রায় নীরব প্রতিক্রিয়ার কারণে ভারতের নৈতিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ঔপনিবেশিক-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ভারত ছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃরাষ্ট্র। শীতল যুদ্ধের সময় বহু উন্নয়নশীল দেশ এই নীতির মাধ্যমে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। এখন ভারত নিজেকে আর নন-অ্যালাইন্ড বলে না, তারা এটিকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলে উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবে দেশটি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের, বিশেষ করে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা চালানোর মাত্র দুই দিন আগে মোদি ইসরায়েলে ছিলেন। সেখানে তিনি সংসদে ভাষণ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নেতানিয়াহু তাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সময়ে ইরানও ভারতের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ছিল। দিল্লি সেখানে কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও মানবিক নানা বিনিয়োগ করেছিল। তবে খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর মোদি এখনো কোনো শোকবার্তা দেননি। বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি নয়াদিল্লিতে ইরান দূতাবাসে গিয়ে শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আইআরআইএস ডেনায় হামলার ঘটনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় সামরিক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকায় ভারতের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছিল না। তবে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর কত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং এর প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতার সীমা কোথায় ।’
রাঘবনের ভাষায়, ‘কূটনৈতিকভাবে ভারত বাস্তবে এই যুদ্ধে আগ্রাসীদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে, ইসরায়েল সফর এবং ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নীরবতার মাধ্যমে।’
রাঘবন সতর্ক করেন, ‘এতে অঞ্চলে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পশ্চিম এশিয়ায় এর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব পড়বে।’
লেখক: কলামিস্ট
আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘হাউ ইউএস সিংকিং অব ইরানিয়ান ওয়ারশিপ ব্লিউ হোল ইন মোদি’স গার্ডিয়ান ক্লেইম” শীর্ষক ফিচার কলামটি অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]